সংসার টানতে দিনমজুরি নবম শ্রেণির সীমার

78

সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা : এভাবে যে সংসারের দায়িত্ব পুরোটাই সামলাতে হবে তা কোনওদিন ভাবেননি প্রমীলা দাস। আর অবস্থা এখন এতটাই খারাপ যে দিনমজুরির কাজে নিজের স্কুল পড়ুয়া মেয়েকেও নিয়ে যেতে হচ্ছে। স্বামী ঘৃত দাস লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন। বড় ছেলে হঠাত্ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। অবশ্য তার চিকিৎসার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা দীপক রায় কিছুটা আর্থিক সাহায্য করেছেন। আর ভাতের জন্য র‌্যাশনের চালই কিছুটা ভরসা। কিন্তু তা দিয়ে তো পুরো সংসার চলে না। এদিকে, রোজ দিনমজুরির কাজও জোটে না। গালামাল সামগ্রীর দামও আকাশছোঁয়া। তাই ফালাকাটার আসাম ক্যাম্প পাড়ার এই পরিবারের কোনও দিন নুনভাত খেয়ে কেটে যায়। তবু ক্লাস নাইনের সীমা দাস ও তার মা হাল ছাড়তে নারাজ। লড়াইটা যত কঠিনই হোক না কেন, তাঁরা তা চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বংশীধরপুর গ্রামের আসাম ক্যাম্প পাড়ায় বাড়ি প্রমীলা দাসের। তাঁর স্বামী ফালাকাটায় চটের বস্তা সেলাইয়ের কাজ করতেন। তা দিয়ে কোনওভাবে সংসার চলে যেত। আর প্রমীলা ছেলেমেয়ে পড়াশোনার জন্য মাঝেমধ্যে দিনমজুরি করতেন। দারিদ্র‌্যের কারণে বড় ছেলে সূর্যকুমার দাস হাইস্কুলের গণ্ডিতে পা রাখেনি। আগে বাইরে থাকলেও সে এখন পণ্যবাহী গাড়ির খালাসি হিসেবে কাজ করছিল। তার বোন সীমা ও ছোট ভাই রাজেশ রাইচেঙ্গা বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলে নবম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। এই ভাইবোনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এতদিন কষ্টের মধ্যেও দিব্যি চলছিল সংসার। কিন্তু এবারের লকডাউন যেন গোটা পরিবারের ওপর অভিশাপ নামিয়ে এনেছে। কাজ হারিয়েছেন পরিবারের কর্তা। বড় ছেলে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। তাই রান্না থেকে শুরু করে বাইরে কাজ করে কিছুটা রোজগার করার দায়িত্ব এখন মা ও মেয়ে কাঁধে।

- Advertisement -

ওই এলাকায় এখন বাদাম ও ভুট্টা তোলার কাজ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই প্রমীলা তাঁর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দিনমজুরির কাজে যাচ্ছেন। সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পরিশ্রম করে জনপ্রতি মজুরি মিলছে ১৬০ টাকা। কিন্তু এই কাজটাও রোজ মেলে না। আবার ছেলেকেও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রমীলা বলেন, মেয়ের স্কুল বন্ধ। ইচ্ছে না থাকলেও উপায় নেই। কারণ বাড়িতে বাকিদের রোজগার বন্ধ। তাই মেয়েকেও কাজে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ছেলে অসুস্থ। তাকে নিয়ে এখন চিন্তা হচ্ছে। ওর চিকিৎসার টাকা কোথায় পাব জানি না।

এভাবে যে পরিবারের পরিবেশটা বদলে যাবে তা ভেবেই উঠতে পারছে না নবম শ্রেণির সীমা। সে জানাল, বাবা ও দাদার জন্য কষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া স্কুলও বন্ধ। তাই মায়ের সঙ্গে কাজে যাচ্ছি। এই লড়াই যে আগামীতে আরও কঠিন হবে তা ষোলো বছর বয়সেই ধরে নিয়েছে ওই ছাত্রী। এদিকে, গোটা বাড়িতেই দারিদ্র‌্যের ছাপ স্পষ্ট। ভাঙাচোরা একটি টিনের ঘর। বৃষ্টি হলেই ঘরে জল পড়ে। তখন মশারির ওপর প্লাস্টিক ঢেকে দিতে হয়। আর কালো পলিথিনে মোড়া একটি রান্নাঘর। র‌্যাশন কার্ডও অন্ত্যোদয় যোজনার নয়। এসপিএইচএইচ কার্ডে জনপ্রতি দুকেজি করে চাল ও তিন কেজি করে আটা বা গম মেলে। পরিবারের কর্তা ঘৃত দাস বলেন, সরকারি ঘর পাইনি। এখন ভাতের জন্য র‌্যাশনের চালটুকুই আমাদের ভরসা। কিন্তু এখন গালামাল দোকানের সামগ্রীর দাম বেড়েছে। তাই কোনওদিন নুনভাত খেয়ে থাকতে হয়।

ছেলের চিকিৎসার জন্য পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল কমিটির সহ সভাপতি দীপক রায়। তিনি বলেন, কদিন আগে হঠাৎ ওই বাড়ির সূর্যকুমার অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে ৫০০ টাকা দিই। পরে ডায়াবিটিস ধরা পড়ে। দলীয় তহবিল থেকে ২,৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। আমরা ওঁদের পাশে আছি।