ডিসেম্বর থেকে কোভ্যাকসিনের ট্রায়াল হবে পশ্চিমবঙ্গেও

211

নয়াদিল্লি ও কলকাতা : ভারতে করোনা সংক্রমণে স্থায়ীভাবে বাঁধ দিতে হলে টিকার গণপ্রয়োগ জরুরি। এ ব্যাপারে কার্যত একমত সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বড় মাত্রায় উত্পাদন শুরু করতে টিকার হিউম্যান ট্রায়াল শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি। বর্তমানে এ দেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকার কোভিশিল্ড, ভারত বায়োটেকের কোভ্যাকসিন ও গ্যামেলিয়া ইনস্টিটিউটের স্পুটনিক ভি-র দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। এদের মধ্যে কোভিশিল্ড সম্ভবত সবার আগে বাজারে আসতে চলেছে। তবে ১৩০ কোটির দেশে সবার কাছে টিকা পৌঁছে দিতে শুধু কোভিশিল্ড যথেষ্ট হবে না। কারণ,সকলকে দেওয়ার মতো একটি নির্দিষ্ট টিকা উত্পাদন করতে হলে বছর ঘুরে যাবে। সূত্রের খবর, সেকারণে একাধিক টিকা প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে কেন্দ্র। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাথমিকভাবে কোমর্বিডিটির কারণে মৃত্যুর ঘটনায় রাশ টানতে চাইছে সরকার। এ জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে টিকা প্রয়োগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের টিকা দেওয়া হবে। এ জন্য রাজ্যগুলিতে প্রাপকদের চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে সেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।  দীর্ঘ আট মাস অতিক্রমের পর পশ্চিমবঙ্গে প্রথম টিকা পরীক্ষা (ক্লিনিকাল ট্রায়াল) করার ছাড়পত্র দিল কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা নাইসেড। রাজ্যে এই প্রথম কোভিড ভ্যাকসিনের ততীয় পর্যায়ের ট্রায়াল হবে। ভারতের ২৬ টি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রায় ২৬০০০ স্বেচ্ছাসেবকের উপরে পরীক্ষা চালাচ্ছে আইসিএমআর।

দ্বিতীয় পর্যায়ে টিকা বণ্টন পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজাতে চাইছে কেন্দ্র। টিকা বণ্টনে ভারসাম্য রাখতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বণ্টন পরিকাঠামোর রূপরেখা তৈরি করছেন। জানা গিয়েছে ফিকি, সিআইআইয়ের মতো সর্বভারতীয় বণিক সংগঠনগুলিকে টিকা বণ্টনের কাজে যুক্ত করা হতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সমন্বয়ে কাজও আগে থাকতে সেরে রাখতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভ্যাকসিন উত্পাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে শুক্রবার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই ভার্চুয়াল বৈঠকে নীতি আয়োগের কর্তাদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ যোগ দিয়েছিলেন। পরে টুইটারে প্রধানমন্ত্রী জানান, টিকা উত্পাদন, বণ্টন, প্রাপকদের অগ্রাধিকার সহ সামগ্রিক ভ্যাকসিন নীতি তৈরির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। শুক্রবার কেন্দ্রের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতে ৫টি টিকা গবেষণার কাজে অগ্রগতি ঘটেছে। তার মধ্যে ৪টি টিকার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের প্রয়োগ চলছে। ভারতীয় সংস্থাগুলির টিকা গবেষণায় বাংলাদেশ, মায়ানমার, কাতার, ভুটান, বাহারিন, অস্ট্রেলিয়া, সুইত্জারল্যান্ডের মতো দেশকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।প্রয়োগ সফল হলে ওইসব ভারতের পাশাপাশি ওইসব দেশেও টিকার গণপ্রয়োগ শুরু হবে বলে কেন্দ্র জানিয়েছে।

- Advertisement -

পর্যবেক্ষকদের মতে, করোনা টিকার গণপ্রয়োগ শুরু করতে কোভিশিল্ড ও কোভ্যাকসিনের গুরুত্ব বেশি। ২টি টিকার দামই অন্যগুলির তুলনায় কম হওয়ার কথা। এগুলির কার্যকারিতা ৯০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে অক্সফোর্ডের তৈরি কোভিশিল্ড টিকা উত্পাদনের দাযিত্ব পেয়েছে সিরাম ইনস্টিটিউট।কোভিশিল্ডের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রায় শেষের পথে। অন্যদিকে, ভারত বায়োটেকের কোভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ে ট্রায়াল শুরু হতে চলেছে। এই ট্রায়ালের জন্য কলকাতাস্থিত কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা নাইসেডকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে এখানে স্বেচ্ছাসেবকদের টিকাকরণের কাজ শুরু হওয়ার কথা। নাইসেডের ডিরেক্টর শান্তা দত্ত জানিয়েছেন, দেশের ২৬টি কেন্দ্রে ২৫ হাজার ৮০০ জনকে পরীক্ষামূলকভাবে কোভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এর মধ্যে একহাজার টিকাকরণের দায়িত্ব পেয়েছে নাইসেড। তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী, স্বেচ্ছাসেবকদের দুটি দলে ভাগ করা হবে। একটি দলকে কোভ্যাকসিন দেওয়া হবে। অন্যদের টিকার বদলে অন্য ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। নির্দিষ্ট সময় দুই দলকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তাঁদের শারীরিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানা, বিহার, কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে এই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হতে চলেছে। শুক্রবার থেকে ওডিশায় কোভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়ে গিয়েছে। নাইসেড কোভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হতে পারলেও পশ্চিমবঙ্গের আর কোনও চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় নেই। যদিও স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও সাগর দত্ত মেডিকেল কলেজও করোনা টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আবেদন জানিয়েছিল। এর মধ্যে ট্রপিক্যাল মেডিসিন কোভ্যাকসিনের ট্রায়ালের আবেদন করে। সূত্রের খবর, সেই প্রস্তাব এখনও ঝুলে রয়েছে। সাগর দত্ত আবেদন জানিয়েছিল রাশিয়ার গ্যামেলিয়া ইনস্টিটিউটের তৈরি স্পুটনিক ভি-এর ট্রায়ালের জন্য। সেই আবেদনও এ পর্যন্ত মঞ্জুর হয়নি। বর্তমানে করোনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে মহারাষ্ট্রে। ওই রাজ্যের ৯টি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়াল চলছে। তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশের ৩টি করে প্রতিষ্ঠানে এই ট্রায়াল চলছে বলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রেজিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া (সিটিআরআই) জানিয়েছে।