জয়গাঁ সীমান্তের বন্ধ গেটেই লেখা জয়ের ঠিকানা

95

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, জয়গাঁ : রেলিংয়ের মাঝখান দিয়ে হাত বাড়ালেই দিব্যি ছোঁয়া যায় ও দেশের কোনও গাছের পাতা। চাইলে এ পারের বহুতলের লোক ও পারের আবাসনের চেনা প্রতিবেশীর সঙ্গে একটু চেঁচিয়ে কথাও বলতে পারে কোথাও কোথাও। দেওয়ালের এ পারে তিন কিশোর সাইকেলে যেতে গিয়ে পড়ে গেল হয়তো। হইচই শুনে ও দেশের বড় আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী চেয়ারে বসেই এ দিকে তাকান। বুঝতে চান, ঠিক কী হয়েছে।

এ দেশ থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ও দেশের দোকানগুলোর নাম। সেলুন, মেডিকেল শপ, স্টেশনারি, হোটেল—সব। তবু আর এ দেশ থেকে ও দেশে যাওয়া যাচ্ছে না আগের মতো। সীমান্তের সুদৃশ্য গেটের সামনে জমাট বেঁধে হিরণ্ময় নীরবতা। লোহার বিশাল গেট লাগানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। যখন ও দিক থেকে কিছু গাড়ি এ দেশে ঢুকছে।

- Advertisement -

এবং ভারত-ভুটান সীমান্তের এক বছর বন্ধ প্যাগোডা গেটই যেন বিধানসভার ভোটে জয়ের চাবি নিয়ে বসে আছে। ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের মতো অনেকটা। কৌটোর মধ্যে জিয়নকাঠি-মরণকাঠি থাকত সেখানে। আর এখানে দরজার ও পারে জয়ের ফুল। ভুটান গেট খুলে দাও এবং ভোট নিয়ে যাও।

এ দিকে জয়গাঁ, ও দিকে ফুন্টশোলিং। করোনার পর এক বছরের বেশি সীমান্ত বন্ধ করে রেখেছে ভুটান। ১৯৬৪ সালের এই এপ্রিলে ফুন্টশোলিংয়ে তাস খেলার সময় গুলিতে খুন হয়েছিলেন ভুটানের সংস্কারক প্রধানমন্ত্রী জিগমে পালদেন দোরজি। সেনা প্রধান ও রাজার কাকার নির্দেশে। রাজা তখন সুইৎজারল্যান্ডে। তারপর এমন ভয়ঙ্কর কালো সময় কখনও আসেনি এই যমজ শহরে।

ও পারে কী হচ্ছে জানি না, এ পারের জমজমাট জয়গাঁ ধীরে ধীরে মৃত নগরীতে পরিণত। কয়েকশো কোটির অর্থনীতি বিপন্ন। যে রাস্তা দিয়ে ভিড়ের জন্য যাওয়াই যেত না, কার্যত স্তব্ধ । অধিকাংশ দোকান বন্ধ। যে সব খোলা, সেখানে থরে থরে হতাশার পসরা। প্রাচীর লাগোয়া মার্কেট জুড়ে সব শূন্যতা। মলের সিকিউরিটি রাখার দায়িত্বে থাকা তরুণীরা আড্ডা মারছেন রাস্তায়। ম্লান মুখ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে চার বছর আগে প্রধান গেটের সামান্য দূরে, দ্বিতীয় গেট হয়েছে সীমান্তে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, পণ্যবাহী অসংখ্য ভারতীয় ট্রাক ঢুকছে ভুটানে। প্রধান গেটের কাছে পরপর পাশাপাশি তিনটি বাঙালি হোটেল। একটিতে জনা তিনেক তরুণ। শুনলাম, ভুটান শুধু এঁদের মতো ইঞ্জিনিয়ার-মজুর জাতীয় পেশার ভারতীয়দের ও পারে যেতে দিচ্ছে। দুটি গেটের মাঝে ছোট একটি গেট। করোনার আগে সেখান দিয়ে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়ার মতো  টুক করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া যেত ভুটানে। মঙ্গলবার সেই গেটে এক ছায়ামূর্তিকে দেখে চমকে উঠতে হয়। এক পাগলিনী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সেখানে। ওপরের গেটে লেখা নো এন্ট্রি।

ভোট! ভোট নিয়ে ভাববে কে? আলিপুরদুয়ার জেলার প্রত্যন্ত জয়গাঁ এখন ভাবছে, শহরটা বাঁচবে তো! মারোয়ারি, বিহারিদের চিরকাল রমরমা এখানে। ব্যবসা না থাকায় অজস্র লোক ছেড়ে দিচ্ছেন শহর। হাসপাতালের ডাক্তাররাও চলে যাচ্ছেন, ফিরছেন না। বিপদে রোগীরা।

হনুমান টেম্পল রোডের মনুষ্যহীন মার্কেটে গোটা কয়েক বিজেপি পতাকা শুধু বোঝাতে চায়, ভোট আসছে। বিশাল দোকানে বসেছিলেন মধ্যবয়সিনী ঐশ্বর্য মিত্তল। হরিয়ানা থেকে এসেছেন বহুদিন। তিনি ও তাঁর মা বসে। ভয়ার্ত গলায় চূড়ান্ত হতাশা, ইতনা সন্নাটা! এমন যে হতে পারে, স্বপ্নেও ভাবিনি। কত যে ক্ষতি হচ্ছে, ভাবতে পারবেন না। বিক্রি কিছু নেই। বাড়িতে কিছু করার নেই বলে দোকান খুলে বসে আছি। ভোট চাইতে কোনও নেতা এসেছিলেন? ঘাড় নাড়েন। কেউ আসেননি।

তৃপ্তি হোটেলের তরুণ মালিক সোনম বিশ্বাস নিয়মিত শুনছেন ভুটান রেডিও। যদি খবর মেলে, কবে খুলছে ভুটান গেট?  শহর ঘুরে তিনটি তত্ত্ব মিলছে লোকের মুখে মুখে। এক, ভোটের পরে খোলা হবে গেট। দুই, পুজোর আগে খোলা হতে পারে। তিন নম্বরটি সবচেয়ে মারাত্মক। ভুটান বুঝেছে, এ সীমান্ত খোলা থাকলে ব্যবসায় ভবিষ্যতে তাদের কোনও লাভ নেই। সব লাভ জয়গাঁর। তাই তারা আর সীমান্ত খোলার ব্যাপারে উৎসাহী নয়। বৃহস্পতিবার থেকে ফুন্টশোলিংয়ে ক্লাস নাইন থেকে  ইলেভেন খুলেছে শুনে জয়গাঁয় এমন চাপা উল্লাস, যেন এখানকার টিম আইপিএলে খেলবে।

সীমান্ত থেকে কয়েকশো ফিট দূরে লিঙ্ক রোডে তৃণমূল অফিস সাজানো গোছানো, কিন্তু ফাঁকা। এক তরুণ বোঝাচ্ছিলেন, কী করে ভোটের জন্য কেন্দ্র আর ভুটান গেট খোলার দিকে নজর দিচ্ছে না। জয়গাঁ নির্বাচনে পড়ছে তুলনায় ছোট শহর কালচিনির বিধানসভা কেন্দ্রে। একেই সেখানে দাপুটে নেতা মোহন শর্মা পার্টি ছেড়ে বিজেপিতে যাবেন বলে তৃণমূল মারাত্মক চাপে। তারপর এই গেট না খোলায় আরও শুকনো তৃণমূল কর্মীদের মুখ। বুঝতে পারছেন, সময় ভালো নয়। মমতার দ্বিতীয় ভুটান গেট খোলার কৃতিত্ব ভুলেই যাচ্ছে শহরবাসী। অবশ্য অনেকের ক্ষোভ, কেন্দ্র কেন ভুটান সরকারকে এত তৈলমর্দন করে চলছে?

ঘুরেফিরে রাজনৈতিক কিচিরমিচিরের কেন্দ্রে সেই গেট। লাভ অবশ্যই বিজেপির। অধিকাংশ লোক ভাবছে, ভুটানকে রাজি করাতে পারে শুধু কেন্দ্র। ননী ভট্টাচার্য, ডেনিস লাকরা বা মনোহর তিরকের মতো এই কেন্দ্রের জাঁদরেল বিধায়করা অতীতে এমন কিম্ভূত সমস্যায় পড়েননি।

যমজ শহরের পাশে সমতলে প্রথম পা দিয়েছে অতিপরিচিত তোর্ষা নদী। বসন্তের স্রোতহীন তোর্ষাও এই জলগাঁও-ফুন্টশোলিংয়ের তুলনায় বেশি প্রাণময়। সীমান্তের দেওয়াল লাগানো সাজানো দোকানে ভুটানিজদের পোশাক। ও দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করেন আলিপুরদুয়ার থেকে আসা শঙ্কর সর্দার, ওরাও কিন্তু ভালো নেই। এই সব পোশাক কোথায় পাবে?। তিনি সোনার কাজ করেন। তাঁর দোকান বন্ধ। ও পারেও তো বড় বড় বাড়ির অধিকাংশ জানলা বন্ধ।

রাস্তায় ঘুরলে যে কেউ টের পাবে, ভোট ভুলে এ শহরের জনতা খোঁজ নিচ্ছে, ও পারে বিপন্নতা কত তীব্র। ভুটানিজদের আসলে জয়গাঁ বাজার থেকে আলু, কাঁচালঙ্কা সস্তায় কিনে টুক করে ঘরে ঢুকে যাওয়া অভ্যাস। এখন ভুটানে তরিতরকারির যা আগুনে দাম, তা আলিপুরদুয়ার জেলার নানা শহরে আলোচনার বিষয়।

ভুটান গেটের ঠিক সামনে প্রধান রাস্তাটা যেখানে ইউ টার্ন করেছে, সেখানে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের নতুন আবক্ষ মূর্তি। জয়গাঁ শহরের ভোজপুরী যুবা মঞ্চের উদ্যোগে তৈরি। কালো পাথরে উদ্বোধক হিসেবে নাম দেখলাম সেই মোহন শর্মার। যাঁর বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল যাওয়া নিয়ে জেলা সরগরম। পাথরের রাজেন্দ্রপ্রসাদও বোধহয় ভোট ভুলে আপাতত তাকিয়ে রাজনীতির ভুটান গেটের দিকে। কবে যে আবার মৃত শহরে প্রাণের জোয়ার আসবে?