ভোট মিটতেই অসম-বাংলা সীমান্তে ফের সক্রিয় কয়লা সিন্ডিকেট

0
406

আলিপুরদুয়ার ব্যুরো, ২২ এপ্রিলঃ প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ি জেলায় লোকসভা ভোট শেষ হতেই অসম-বাংলা সীমান্তের নাজিরান দেউতিখাতা এলাকায় ফের কয়লা বোঝাই ট্রাক থেকে তোলা আদায় শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, শাসকদলের নেতাদের চাপেই মাঝে কিছুদিন বন্ধ ছিল এই তোলা আদায়। উত্তরের তিন জেলায় ভোটগ্রহণ পর্ব মিটে যেতেই ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কয়লা সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

মাঝে দিন পনেরো বন্ধ থাকলেও অভিযোগ, দুতিনদিন ধরে কোচবিহার জেলার অসম-বাংলা সীমান্তে সংকোশ সেতুর মুখে জাতীয় সড়কের উপর পুলিশের মদতে কয়লার নাকা শুরু করেছে তোলাবাজরা। পুলিশের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশ করেই অবাধে কোটি কোটি টাকার তোলা আদায় চলছে। এ ব্যাপারে বিরোধী দলের নেতারা অবশ্য সুর চড়িয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের একটি অংশের নেতাদের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ, তৃণমূলের ওই নেতাদের মদতেই তোলাবাজদের কারবার রমরমিয়ে চলছে। অন্যদিকে, কয়লার গাড়ি থেকে তোলা আদায় সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পদক্ষেপ করার কথা বলেছেন আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক তথা জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তী।

ভিনরাজ্যের ট্রাকচালকরা জানান, মাঝে কিছুদিন কয়লার এন্ট্রি বন্ধ ছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা নাগাদ সংকোশ সেতুর মুখে আচমকা পুলিশের নাকা শুরু হয়। যাচাইযে নামে কয়লা বোঝাই গাড়িগুলির কাগজপত্র নিয়ে নেয় পুলিশ। এরপর শুক্রবার সকালে একটি চিরকুটে ৮৭২৩৮১৮৩৫৬- এই মোবাইল নম্বরটি লিখে দেয় এবং গাড়ি ছাড়ানোর জন্য ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলে সিন্ডিকেটের লোকজন। ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে গাড়ির কাগজপত্র ফেরত এবং বেঙ্গল এন্ট্রি বাবদ গাড়িপিছু আট হাজার টাকা জমা না দেওয়ার অপরাধে জোর করে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা (গুন্ডা ট্যাক্স) আদায় করে কয়লা সিন্ডিকেটের সদস্যরা। গাড়ির মালিক এবং ট্রান্সপোর্ট এজেন্ট ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে তোলাবাজদের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের গুন্ডা ট্যাক্স জমা দেন। টাকা ট্রান্সফারের বিষয়টি খতিয়ে দেখে কয়লা সিন্ডিকেটের লোকজন গাড়ির কাজগপত্র ফেরত দেয়।

এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ কয়লা বোঝাই ট্রাক যাতায়াত করে। মেঘালয় থেকে আসা কয়লা অসমের তিনসুকিযা, গুয়াহাটি, যোগীঘোপা, বেলতলা সহ বিভিন্ন জায়গায় মজুত করা হয়। সেখান থেকে কয়লা বোঝাই করে বিহার, উত্তরপ্রদেশ কিংবা নেপাল যাওয়ার পথে জাতীয় সড়ক ধরে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকামাত্রই সীমান্তের সংকোশ সেতুর মুখে পুলিশকর্মীরা গাড়ি আটকে দিচ্ছে। বেঙ্গল এন্ট্রি কাটা না থাকলে একপ্রকার জোর করেই গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মোটা অঙ্কের তোলা আদায়েকর পর কয়লা মাফিয়াদের হাত দিয়ে ফেরত আসছে গাড়ির কাগজপত্র। তা-ও আবার তাদের মর্জিমতো। জাতীয় সড়কের কোথায় কাগজপত্র ফেরত দেওয়া হবে সেটাও মোবাইলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিজেপির আলিপুরদুযার জেলা সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায়ের অভিযোগ, কয়লার গাড়ি থেকে তোলা আদায় নিয়ে বিরোধিতা করায় তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী তাঁর দলের কর্মীদের মারধর করেছে। তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা পুলিশকে দিয়ে মিথ্যা মামলাও করিয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, লোকসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর আমরা এই ঘুঘুর বাসা ভেঙে দেব। তৃণমূলের নীচুতলার নেতাদের একাংশ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যে কারণে সবকিছু জেনেও পুলিশ ও প্রশাসন এ নিয়ে কোনোরকম পদক্ষেপ করছে না।

সিপিএমের আলিপুরদুয়ার জেলা সম্পাদক মৃণাল রায় বলেন, যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর স্ত্রী বিদেশ থেকে সোনা নিয়ে এসে ধরা পড়েন আর পুলিশ ওই অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করে, সেখানে পুলিশের একাংশের মদতে সিন্ডিকেটের দালালরা কয়ালার গাড়ি থেকে তোলা আদায় করবে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। যদিও বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি তথা আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেব। দলনেত্রীর নির্দেশে রাজ্যের অন্যান্য লোকসভা আসনে ভোট প্রচারের কাজে দক্ষিণবঙ্গে যেতে হচ্ছে। তাই এ নিয়ে এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।