কোচবিহার : কোটি টাকা খরচ করে কোচবিহারে ভবঘুরেদের থাকার জন্য বানানো ‘ঠিকানা’ এখন শাসকদলের দখলে| প্রায় দু-মাস ধরে সেখানে শাসকদলের ১৪-১৫ জন পঞ্চায়েত সদস্য সহ প্রায ৩০ জন আশ্রয নিয়েছেন| এরমধ্যে বক্সিরহাটের রামপুর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতেরই ১০ জন সদস্য রয়েছেন। সরকারি খরচে তৈরি ভবঘুরেদের থাকার জায়গা এভাবে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দখল করায় বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে| কঠোর সমালোচনা করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও| খুব শীঘ্রই বিষয়টি নিয় জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে যাচ্ছে বিজেপি| যদিও বিরোধীদের অভিযোগে আমল দিতে চাননি পুরসভার চেয়ারম্যান ভূষণ সিং|

বছর দেড়েক আগে ঢাকঢোল পিটিযে রাজ্য সরকার কোটি টাকা দিয়ে কোচবিহার শহরের বিবেকানন্দ স্ট্রিটের পাশে ভবঘুরেদের থাকার জন্য বহুতল নির্মাণ করে| তার নাম দেওয়া হয় ঠিকানা। সেখানে প্রায় একশ আবাসিকের থাকার জাযগা রয়েছে| আবাসিকদের জন্য সেখানে অত্যাধুনিক শৌচাগার, স্নানাগার, রান্না করার জায়গা. খাট-বিছানা সবকিছু রয়েছে| কিন্তু যাদের থাকার জন্য ভবনটি করা বছর দেড়েক পার হযে গেলেও সেখানে সেই ভবঘুরেদের দেখা পাওয়া যায়নি| স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ভবঘুরেরা যদি ওখানে নাই থাকে তাহলে কোটি টাকা খরচ করে তাদের জন্য ভবনটি বানানোর কী প্রযোজন ছিল? এই পরিস্থিতিতে সেটি দুস্থ পড়ুয়াদের হস্টেল হিসাবে ব্যবহার করা চিন্তাভাবনাও শুরু হয়েছিল।

কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল হঠাত্ করেই ভবনটিতে বেশ কিছু লোকজন থাকতে শুরু করেছে| বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা ওখানে আচমকা হানা দিলে দেখা যায় ভেতরে অনেক লোকজন রয়েছে| এরমধ্যে অনেকে বসে সেখানে তাস খেলছে| বেশ কিছু মহিলা আবার সেখানে রান্না করছে| সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের দেখেই তারা প্রায রে রে করে ওঠেন| তারা কারা, তাদের পরিচয কী, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে আবাসিকরা কেউই প্রায কিছু বলতে চাননি| আবাসিকদের একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, এখানে তাঁরা প্রায় দু-মাস ধরে রয়েছেন| এর মধ্যে বক্সিরহাটের রামপুর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ১০ জন সদস্য-সদস্যা রয়েছেন| এছাড়া মহিষকুচি-১ ও বারকোদালি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বেশ কয়েকজন পঞ্চায়েত সদস্য রয়েছেন| তাঁদের অনেকে আবার সপরিবারে। তবে বক্সিরহাটের দেবাশিস নামে এক আবাসিক জানান, তাঁরা এখানে প্রায় দু-মাস ধরে রয়েছেন| বিজেপির অত্যাচারের কারণেই তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

ভবনের দায়িত্বে থাকা কোচবিহার পুরসভার কর্মী রাজেশ বিন তেমন কিছু বলতে চাননি| তিনি জানিয়েছেন, কয়েকজন পঞ্চায়েত সদস্য ও তাঁদের পরিবারের লোকজন সহ প্রায় ৩০ জন বেশকিছুদিন ধরে এখানে রয়েছেন| তবে তাঁরা কেন এখানে রয়েছেন, সে বিষযে পুর কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে|

কোচবিহার পুরসভার চেযারম্যান ভূষণ সিং কোনরকম রাখঢাক না করে বলেন, ‘যাঁরা এখানে রয়েছেন তাঁরা বিজেপির অত্যাচারে বাড়ি-ঘর ছাড়া আছে| তাঁদেরই আশ্রয় দেওয়া হয়েছে|’

বিজেপির কোচবিহার জেলা সভাপতি মালতি রাভা বলেন, ‘সরকার যাদের জন্য এই ভবনটা বানিয়েছে সেই ভবঘুরেরা ঠিক আগের মতই রাস্তায ঘুরে বেড়াচ্ছে| আসলে যারা বিজেপির দিকে গিয়েছিল তৃণমূল তাদের ভয় দেখিয়ে, অর্থের প্রলোভন দিয়ে গত দুমাস ধরে এখানে রেখে দিয়েছে| এদের মধ্যে অনেকে বাড়িতে যেতে চায়| কিন্তু তৃণমূল তাদের বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না| আটকে রেখেছে| আমরা শুনতে পাচ্ছি আগামী দু-তিনদিনের মধ্যেই বিডিও অফিসে ওই গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির বোর্ড গঠন করবে তৃণমূল|’ সরকারি ভবনে দলের লোকেদের রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তৃণমূল এখন সরকারি ভবনকে নিজেদের পার্টি অফিসে পরিণত করে ফেলেছে| যে কারণে তারা তাদের ওখানে রেখেছে| বিষযটি নিযে খুব শীঘ্রই জেলাশাসকের কাছে অভিযোগ জানাব|’

পুরসভার বিরোধী দলনেতা তথা সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মহানন্দ সাহা বলেন, ‘এই পুরসভা কোনো নিয়মনীতির তোয়ক্কা করে না| গাযে জোরে তারা পুরসভা চালাচ্ছে| পরিস্থিতি এমনই যে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে পর‌্যন্ত পুরপতিকে সতর্ক করতে হচ্ছে| এটা পুরোপুরি বেআইনি| অবিলম্বে বিষয়টির তদন্ত হওয়া উচিত|’ ফরওযার্ড ব্লকের জেলা সম্পাদক অক্ষয় ঠাকুর বলেন, ‘তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্যরা কাটমানি খেয়েছে এতদিন| এতে তারা এলাকায় থাকতে পারছে না| মুখ লুকানোর জন্য তারা এখন ভবঘুরেদের থাকার জাযগায আশ্রয় নিয়েছে|

ছবি- ভবঘুরেদের ঠিকানা এখন তৃণমূল নেতাদের থাকার জায়গা।–জয়দেব দাস

তথ্য- গৌরহরি দাস