সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি, ৬ জুলাই : কেউ সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে, আবার কেউ স্নাতক হওয়ার পথে। এমন অনেককেই মুনাফার লোভ দেখিয়ে ড্রাগ বিক্রির পেশায় টানছে মাদকচক্রের পান্ডারা। নেপাল থেকে শিলিগুড়ি হয়ে ও বাংলাদেশ থেকে কোচবিহার হয়ে এই মাদক আনা হচ্ছে। মুনাফার লোভ দেখিয়ে কমবয়সি কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে থেকেই সেলার নেওয়া হচ্ছে। পকেটমানি জোগাড়ের তাগিদ ও বিনামূল্যে মাদকের লোভে বেশ কিছু পড়ুয়া ইতিমধ্যেই সেলার হয়ে গিয়েছে।

জানা গিয়েছে, মূলত দুভাবে এই মাদকের চক্র চলছে। সাদা রঙের একরকম ট্যাবলেট আসছে যা স্যালাইন ওয়াটারের সঙ্গে মিশিয়ে ৪-৫ মিলিলিটার সিরিঞ্জের মাধ্যমে ইনজেকশন হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। কাস্টমার বুঝে একশো থেকে আড়াইশো টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে এই ট্যাবলেট। মাদকচক্রের ভাষায় এই ট্যাবলেটের নাম ডাক্তার। ট্যাবলেট ছাড়াও মিলছে হেরোইন পাউডার। এটি সিগারেটের সঙ্গে বা নাক দিয়ে টেনে অথবা রাংতার উপর রেখে নীচে আগুনের তাপ দিয়ে মুখে নেওয়া হচ্ছে। চক্রের পান্ডারা একে বলছে পুরিয়া। সাধারণত নেশার বাজারে গাঁজার প্যাকেটকে পুরিয়া বলা হয। তাই অনেকেই পুরিয়া শুনে গাঁজা ভেবে খুব বেশি মাথা ঘামান না। আর তার ফলে মারাত্মক এই মাদকের নেশায় না জেনেই অনেকে আসক্ত হন। এই পুরিয়া কাস্টমারের আর্থিক ক্ষমতা অনুযায়ী পাঁচশো থেকে আড়াই হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়।

কাস্টমার তৈরির জন্য চক্রের পান্ডাদের মূল টার্গেট সচ্ছল পরিবারের কমবয়সি ছেলেরা। প্রথমে সেলারদের মাধ্যমে বিনা পয়সায় এইসব মাদক দেওয়া হয়। তারপর কিছুদিন গেলেই প্রথমে বাকিতে, তারপর ক্যাশে ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি হয় এই মারাত্মক মাদক। সূত্রের খবর, শহরের বুকে একাধিক নির্মীয়মাণ ভবনের দোতলা বা তিনতলার ছাদে প্রায়ই এই ধরনের মাদকের আসর বসছে। এইসব মাদক নেওয়ার পর কিছুক্ষণের জন্য খিঁচুনি, মুখ দিয়ে লালা পড়া বা চোখ লাল টকটকে হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই কারণে খোলা মাঠের বদলে নির্জন ছাদ বা কোনো ভবনের চারদিক ঢাকা জায়গাতেই বসছে মাদকের আসর।

বেশ কয়েকজন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, ধনী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ব্যক্তির ঘরের ছেলেরাও এই চক্রের শিকার। কয়েকজন অভিভাবক তাদের ছেলেদের এই চক্র থেকে বের করে আনার চেষ্টা শুরু করেছেন। তবে জোর করে রিহ্যাবে পাঠানোর ফলে তারা মারাত্মকভাবে উইথড্রয়াল সিনড্রোমে ভুগছে। এরকমই এক ছাত্রকে সদ্য রিহ্যাব থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনেছেন তাঁর অভিভাবক। তিনি বললেন, ওর কলেজ বাইরে, অথচ বেশিরভাগ সময়ই ধূপগুড়িতেই থাকার বায়না করত। যার কারণ প্রথমে বুঝিনি। যখন বুঝলাম তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। ৪৫ দিন রিহ্যাবে থাকার পর ছেলেকে বাড়িতে এনেছি। কিন্তু যা পরিস্থিতি তাতে কতদিনে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে জানি না। একবারে সব নেশা বন্ধ করে দিলে খারাপ হতে পারে বলে চিকিৎক ও কাউন্সেলরদের পরামর্শমতো বাড়িতে মাঝেমধ্যে নেশা করতে দিতে বাধ্য হচ্ছি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দীপাঞ্জন সান্যাল বলেন, বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানের পকেটমানির সঙ্গে জীবনযাত্রার বড়ো পার্থক্য হচ্ছে কিনা তা নজরে রাখা। সেইসঙ্গে সন্তানের মধ্যে নিয়মিত বমিবমি ভাব, অতিরিক্ত উদ্বেগ, আবেগ বা রাগ হচ্ছে কিনা তাও নজরে রাখা দরকার। যারা মাদক নেয় তাদের মধ্যে শুরু থেকেই কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা যায়। যা নজরে রাখলে সমস্যা বাড়ার আগেই সমাধান সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ধূপগুড়ি থানার আইসি সুবীর কর্মকার বলেন, আমাদের কাছে এবিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে আমরা নিয়মিত নজরদারি চালাই। এমন কিছুর আভাস পেলে আমরা দ্রুত আইনানুগ পদক্ষেপ করব।