বৃষ্টিভেজা কুলিক বনে রঙিন প্রজাপতির মেলা

সুকুমার বাড়ই, রায়গঞ্জ : বৃষ্টিভেজা রায়গঞ্জের কুলিক বন যেন স্নান করে সেজে উঠেছে। কোনও কোনও গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছে। শিমুল, শিরীষ, কদম, আকাশমণি, খয়ে, শাল, পিটালি, ইউক্যালিপ্টাস, জারুল, অর্জুন, শিশু ইত্যাদি গাছেরা বনে যেন নড়েচড়ে বসেছে। ছোট গাছ, গুল্মরাও যেন বাঁচার রসদ পেয়েছে বৃষ্টি থেকে। সবুজ গাছগাছালিকে আনন্দের খবর দিতে ছুটে এসেছে রং বেরং-এর প্রজাপতি। সমাজে এমন কোনও মানুষ নেই যিনি প্রজাপতিকে ভালোবাসেন না। প্রকৃতিকে অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে তোলে প্রজাপতি। প্রজাপতি খুবই উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় বলে সহজেই সকলের নজর কাড়ে। কুলিকের এই প্রজাপতি দেখে মনের মধ্যে গুনগুন করে ওঠে, প্রজাপতি প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা, টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা।

দু-এক প্রজাতির নয়, কুলিক বনের আনাচেকানাচে ঘুরলে দেখা মিলবে নানা প্রজাতির প্রজাপতি। সৌন্দর্য বিলানোর জন্যই যেন ওদের জন্ম। প্রজাপতি নিয়ে কাব্য সাহিত্যে আছে নানা বর্ণনা। প্রকৃতির অনুসঙ্গ এ প্রজাপতি যেন মায়াবী মুগ্ধ পতঙ্গ। অনাবিল সৌন্দর্যের প্রজাপতি যেন সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে গড়া এক শিল্পিত প্রাণ। কুলিক বন চত্বরে বহু প্রজাতির প্রজাপতির খোঁজ পাওয়া যায়। এখানে কমন ওয়ানডেরার, বারোনেট, অ্যাঙ্গলেড ক্যাসটর, গ্রেট এগফ্লাই, কমন ক্যাসটর, ব্লু মরমন, কমন মরমন, কমন গ্রাস ইওলো, রাইস সুইফট, কমান্ডার, মটলেড এমিগ্র‌্যান্ট, লাইম, কমন সেইলর, পামফ্লাই, কমন মাইম, পিকক প্যান্সি, গ্রেপ্যান্সি, লেমনপ্যান্সি, কমন ক্রো, কমন ইভিনিং ব্রাউন, কমন ব্যারোন, সাইক, গ্র‌্যাস ডেমন, কমন সিলেট ব্লু, কমন টিগার, পাল গ্র‌্যাস ব্লু, কমন রেড আই, লাইম ব্লু, চকোলেট রয়্যাল, ডার্ক গ্র‌্যাস ব্লু, হোয়াইট টুফটেড রয়্যাল, স্কারলেট ফ্ল্যাস, শ্রীলঙ্কান কমন কুয়াকার, ডার্ক পাল্ম ডার্ট, অ্যাপেফ্লাই, কমন ব্রুশ ব্রাউন, কমন জ্যা, কমন লিওপার্ড, কমপ্লিট পেন্ট ব্রাশ সুইফ্ট, ইয়ামফ্লাই, মায়ানমার কমন কুয়াকার ও লেসার গ্র‌্যাস ব্লু প্রজাপতির সন্ধান পাওয়া যায়।

- Advertisement -

ওদের গায়ে রং সাদা, বাদামি, হলুদ, কালো, নীল, ছাই, রানি, বেগুনি কমলা, আকাশি। শিয়ালমণি বনাঞ্চল, আবদুল ঘাটা বনাঞ্চল, কুলিক পাখিরালয় বনাঞ্চল, জাতীয় সড়কের দক্ষিণের বনাঞ্চলে গেলে প্রায়ই চোখে পড়ে নানা রং-এর প্রজাপতি। কুলিক বনের প্রজাপতির এই বাড়বাড়ন্ত দেখে বন দপ্তর কুলিক পাখিরালয়ে তৈরি করেছে প্রজাপতির বাগান। পাখিরালয় চত্বরে প্রজাপতির অবাধ বিচরণ ও খাদ্য হিসাবে মধু সংগ্রহ করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সে জন্য বনকর্মীদের আগাছা ও নানা ফুলগাছ না ছাঁটার নির্দেশ দেওয়া আছে। এই মর্মে হাতিশুঁড়, ভেরেন্ডা, লেবু, আতুসি, করবি, এরিকাপাম, দারুচিনি, পাউডার ফ্লো, পলাশ ফুল, নারকেল, আকন্দ, ক্যাথিয়া এলাটা, বেল, পেয়ারা, মাধবীলতা, প্যাসিফ্লোরা ফিডিডা, দেবদারু, কুল, কদম, সিকমা, রঙ্গন, কারি পাতা, কাঞ্চনসহ নানা গাছ লাগানো হয়েছে যাতে প্রজাপতির প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা প্রকৃতিপাঠে এসে নানা রং-এর প্রজাপতি দেখে খুশি হয়ে ওঠে। পাখি দেখতে এসে বাড়তি পাওনা হিসেবে প্রজাপতি দেখে কুলিক পাখিরালয়ে আসা পর্যটকরাও খুশি হয়। করোনার কারণে মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে পাখিরালয়। কবে খুলবে সে বিষয়ে কোন নির্দেশ এখনও আসেনি বলে জানান, বন আধিকারিক সোমনাথ সরকার। কুলিক বন ১৩০ হেক্টর জমির ওপর গড়ে উঠেছে। কুলিক পাখিরালয় তৈরি হয়েছে ২ হেক্টর জমিতে। পাখি, নানা রং-এর ছত্রাক আর বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির অফুরন্ত ভাণ্ডার হল কুলিক বন। কুলিক পাখিরালয়ে গেলেই, নানা প্রজাতির প্রজাপতির চিত্র এবং বর্ণনা দেখা যায়। পাখিরালয়ে প্রজাপতি বাগানে ও কুলিক অরণ্যে জীবন্ত প্রজাপতিদের দেখে মুগ্ধ হন প্রকৃতিপ্রেমীরাও। রায়গঞ্জের প্রকৃতিপ্রেমিকরা মনে করেন, রাজ্যের আকর্ষণীয় প্রজাপতি উদ্যান হিসেবে খুব শীঘ্রই পরিচিতি পাবে কুলিক অরণ্য।