মোর্তাজা-সোহেলের হাতে সম্প্রীতির দোল শিলিগুড়িতে

90

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : ভেনাস মোড় সংলগ্ন উড়ালপুলের নীচে শিলিগুড়ি হকার্স কর্নারের একটি দোকান নানা রংয়ের আবির থেকে পিচকারিতে সেজে উঠেছে। মালিকের নাম মহম্মদ মোর্তাজা। তাঁর কাছে অবশ্য এই ব্যবসা নতুন কিছু নয়। সগর্বে বলেন, আমাদের মুজফফপুরের গ্রামের বাড়িতে রাখিও তৈরি করে আসছি। আমাদের রাখি শিলিগুড়িতেও আসে।

উলটোদিকের দোকানটাই পড়ে নিবেদিতা মার্কেটের মধ্যে। সেখানে হোলির সম্ভার। মালিকের নাম মহম্মদ সোহেল। তিনিও মোর্তাজার দেশোয়ালি ভাই। রাখি বিক্রির সূত্র ধরেই শিলিগুড়িতে এসেছেন। বলছিলেন, গত দশ বছর ধরে শিলিগুড়িতে আছি। জানি, এ সময় রং বা দোলের জিনিসের কেমন চাহিদা। দশ মিনিট হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় খালপাড়ায়। রেললাইন সংলগ্ন রাস্তার ধারে আবির, রং সাজিয়ে সেখানে বসেছেন মহম্মদ এহসান। স্থানীয় ঝংকার মোড় এলাকাতেই তাঁর বাড়ি। তাঁর কাছে জানা গেল, সারাবছর ছাতা বিক্রি করেন। গত পাঁচ বছর ধরে এই সময়ে দোলের সামগ্রী সাজিয়ে বসেন।

- Advertisement -

মহাবীরস্থানের ফুটপাথে দেখা হল জামাকাপড় বিক্রেতা মহম্মদ সামিমের সঙ্গে। বিহার নয়, বাড়ি মাল্লাগুড়ি। এহসানের মতো তিনিও একেবারে ঘরের লোক। বলছিলেন, দোল এলেই আমার বাবা সইফুদ্দিন আবির নিয়ে বসতেন। বাবা মারা গিয়েছেন। তবে বাবার কাজটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আধুনিকতার যুগে আট থেকে আশি, সকলের কাছেই দোলের অন্যতম আকর্ষণ মুখোশ। মুখোশের এই চাহিদা পূরণে বিহারের সমস্তিপুর থেকে শহরে এসেছেন মহম্মদ মুস্তাফি। দোকানে দোকানে প্রয়োজনীয় মুখোশ বিলি করে বেড়াচ্ছেন।

আজ যখন দেশের চারদিকে সাম্প্রদায়িক অশান্তির ছায়া, তখন এঁরা যেন বছরের পর বছর অজান্তেই শহরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন দোলের আবহে। দোলের রঙে শহরবাসী মেতে ওঠে, আরও রঙিন হয়ে ওঠে সম্প্রীতির উদাহরণ। ভোটকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদাযিক উত্তেজনা যেন হেরে যায় এই পঞ্চমুখের সামনে।

কেন রঙের ব্যবসা বেছে নিলেন? মোর্তাজার উত্তর, মরশুমি ব্যবসা করি। উৎসব হিসেবে দোকান সাজাই। সোহেলের ব্যাখ্যা, এই সময়টায় আবিরের খুব চাহিদা। তাই এই সময়টায় আবির সাজিয়ে বসি। সামিম সটান বলে দেন, বাবা এই আবির বিক্রি শুরু করেছিলেন। বাবা প্রতিবছরই আবির বিক্রি করতেন। বাবা মারা গিয়েছেন। বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতেই এই সময় আবির নিয়ে বসি।  কীভাবে এই ব্যবসার শুরু? মাল্লাগুড়ির সামিম হাসেন, সারাবছর বাবা জিনসের জামাকাপড় বিক্রি করতেন। দোলের সময়ে আশপাশে থাকা হোলসেল দোকানগুলো আবির, রং সাজিয়ে বসত। খুব বিক্রি হতে দেখেই বাবা শুরু করেছিলেন।

মোর্তাজার গলায় আশাবাদ, ছোটবেলা থেকেই গ্রামের বাড়িতে রাখি তৈরি করে বিক্রি করি। শিলিগুড়িতে বন্ধুবান্ধবের কথাতে আসা। রাখির মরশুমের রাখি বিক্রি করলেও বছরের অন্য সময়ে মরশুম হিসেবে কখনও পুজোর মালা, কখনও আবির বিক্রি করি। মহম্মদ এহসান শোনাচ্ছিলেন, আশপাশের পাড়ায় এই সময়ে আবির খেলতে দেখি। গত পাঁচ বছর আবির বিক্রি করছি।

 সাম্প্রদায়িক কারণে ক্রেতার তির্যক নজরে কখনও পড়তে হয়েছে? এহসান উড়িয়ে দিলেন, কখনও নয়, উলটে অনেকে আনন্দের সঙ্গে আবির মাখিয়ে দেয়। প্রশ্নটা শুনে মুস্তাফির উত্তর, আগে মেলা, পুজোর সময়ে মুখোশ নিয়ে আসতাম। এখন পেট চালানোর ভরসা বলতে এই দোল। শহরের দোকানদাররা নিজে থেকে মুখোশ নিয়ে আসার ডাক দেন। মোর্তাজা বলেন, দোকানের নাম দেখে সকলেই বোঝেন। তারপরেও সবাই আমার দোকানে আবির কিনতে আসেন, এটাই তো সবচেয়ে বড় সম্প্রীতি।

বর্তমান সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল অবধারিত। মোর্তাজার গলায় গর্ব, আমরা সবাই ভাই। ওসব আমি ভাবি না।  একইরকম অকপট সামিম, উৎসব সবার। হিন্দুদের উৎসব, মুসলিমদের উৎসব বলে কিছু হয় না। সোহেল লাজুক হাসেন, আমি এ ব্যাপারে কিছু বলব না। এহসানের বাড়তি গর্ব, পাশে হিন্দু বাড়ি। আমরা একসঙ্গে আনন্দে মাতি। মুস্তাফি তো বলেই দিলেন, আসলে পেটের জ্বালার কাছে ধর্ম অপ্রাসঙ্গিক।  সবাই এভাবে এক থাকলেই বেঁচে থাকতে পারব।
সব মিলিয়ে কী দেখা যাচ্ছে রংয়ে আবহে? শিলিগুড়িতে সত্যিই বসন্ত এসে গিয়েছে এঁদের হাত ধরে। সম্প্রীতির বসন্ত।