মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভের পরেও নিম্নমানের রাস্তা তৈরির অভিযোগ

382

বর্ধমান: প্রশাসনিক মূল্যায়ন বৈঠকে গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজের মান নিয়ে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তারপরেও পরিস্থিতির কোন বদল ঘটেনি। কিছুদিন আগে নিম্নমানের রাস্তা তৈরি নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল জেলার জামালপুরের ব্লকের গ্রামণশীপুর গ্রামে। এবার নিম্নমানের রাস্তা তৈরি নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ ছড়াল খোদ পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদ সভাধীপতির বাসভূমি লাগোয়া এলাকার গ্রামে। প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন খণ্ডঘোষের লোধনা পঞ্চায়েতের বারিশালি ও শ্যামাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা। যা নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে জেলার প্রশাসনিক মহলে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ হাতের আঙুলে করে টানলেই সদ্য তৈরি হওয়া রাস্তার পিচ ও পাথরের আস্তরণ উঠে আসছে। এমনকি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ে ট্র্যাক্টর কিংবা বাইক ব্রেক কষলে চাকার সঙ্গে পিচ ও পাথরের আস্তরণ উঠে চলে আসছে। খোদ সভাধীপতির বাসভূমি লাগোয়া এলাকার গ্রামে এমন নিম্নমানের রাস্তা তৈরি হবে তা বারিশালি ও শ্যামাডাঙ্গা গ্রামের কোন মানুষ কল্পনাই করতে পারেন নি। তাই তারা মঙ্গলবার পোস্টার হাতে নিয়ে বিক্ষোভ দেখান। যে পোস্টারে লেখা ছিল, ‘জনগণের টাকা লুট হচ্ছে,’ ‘জনগনের টাকা মেরে খেত দেব না।’ সঠিক মানের রাস্তা তৈরির ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আর রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করতে দেওয়া হবে না বলে এদিন গ্রামবাসীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই রকম নিম্নমানের রাস্তা তৈরি নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ ছড়িয়েছে জেলার গুসকরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইটাচাঁদা এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও। ক্ষোভ বিক্ষোভ মাত্রা ছাড়ানোয় জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের(সড়ক) একটি দল মঙ্গলবার বারিশালি ও শ্যামাডাঙ্গা এলাকায় গিয়ে রাস্তার কাজ খতিয়ে দেখেন। তাদেরও গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়।

- Advertisement -

খণ্ডঘোষ ব্লকের লোধনা পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম বারিশালি ও শ্যামাডাঙ্গা। এই এলাকার বাসিন্দা মহম্মদ বদরে আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের এলাকার মানুষজন পাকা রাস্তা তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সেই দাবি মেনে অবশেষে বারিশালি গ্রাম থেকে শ্যামাডাঙ্গা হয়ে কাপশিট পর্যন্ত প্রায় ৩ কিমি পাকা পিচ রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয়। বদরে আলম বলেন, পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদের সভাধিপতি শম্পা ধারা খণ্ডঘোষের শ্যামাডাঙ্গা গ্রামেরই বাসিন্দা। সেই কারণে স্থানীয় সকলের প্রত্যাশা ছিল তাঁদের এলাকার রাস্তা খুব ভালভাবে তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটাই ঘটেছে। রাস্তা তৈরি হচ্ছে অতিনিম্নমানের। রাস্তার কাজের ওয়ার্ক অর্ডারও প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। ঠিকাদার সংস্থার লোকজনকে ভালভাবে রাস্তা তৈরির কথা একাধিকবার বলেছেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু ঠিকাদার সংস্থার লোকজন কোন কথাই শুনতে চান নি। কয়েকদিন হল রাস্তার প্রায় দেড় কিমি অংশে পিচ ও পাথরের আস্তরণ পড়েছে। এখন হাতের আঙুলে করে টানলেই সেই পিচ ও পাথরের আস্তরণ উঠে চলে আসছে। এমনকি ট্র্যাক্টর ও বাইকের চাকার সঙ্গে পিচ ও পাথরের আস্তরণ উঠে চলে যাচ্ছে। বদরে আলম বলেন, খোদ সভাধিপতির গ্রামের রাস্তা এমন নিম্নমানের হওয়াটা প্রকৃতই লজ্জার বিষয়। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা এদিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ফের নতুন করে ভালভাবে রাস্তা তৈরি করতে হবে। নয়তো তাঁরা রাস্তা তৈরির কাজ আর শুরু করতেই দেবেন না।

নিম্নমানের রাস্তা তৈরি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। খণ্ডঘোষ নিবাসী জেলা সিপিআই(এম) নেতা বিনোদ ঘোষ বলেন, কোনও সরকারী প্রকল্পের কাজে তৃণমূল নেতারা টাকা মারবেন না, কাটমানি খাবেন না এটা কেউ বিশ্বাস করেন না। তার জন্যই এখানকার রাস্তা তৈরি সংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না। নিম্ন মানের রাস্তার কাজই হল সরকারী প্রকল্পের কাজের টাকা নয়ছয়ের আসল উদাহরণ। সব জায়গা থেকে কাটমানি খেলে যা হয় সেটা এই রাস্তার ক্ষেত্রেও যে হয়েছে তা সবাই বুঝতে পারছেন। বিনোদ ঘোষ জানান, খোদ জেলাপরিষদ সভাধীপতির গ্রামের রাস্তা এমন নিম্নমানের হওয়ার থেকে বড় লজ্জার বিষয়।

রাস্তার কাজ নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ ছড়ানোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য জেলাপরিষদ সভাধীপতি শম্পা ধারাকে একাধিক বার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে জেলাপরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ উত্তম সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, “আরআইডিএফ প্রকল্পে জেলাপরিষদ ওই রাস্তাটি তৈরি করছে। রাস্তা তৈরির জন্য ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। উত্তম বাবু বলেন, শুনেছি নিম্নমানের রাস্তা তৈরি হওয়ার অভিযোগ তুলে শ্যামাডাঙ্গা ও বারিশালি এলাকার মানুষজন প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। আমরা জেলাপরিষদের তরফে ওই রাস্তার কাজ খতিয়ে দেখতে যাব। ঠিকাদারের সিকিউরিটি মানি জমা রয়েছে। রাস্তার কাজ খারাপ হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’