বায়নার বাড়াবাড়ি থেকেই জটিল মনোরোগ

202

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : বছর  তেরোর সুজয় একটি নামী ইংরেজিমাধ্যমের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার আবদার, আইফোন চাই-ই চাই। আবদার না মেটায় বাড়ির অ্যাকোয়ারিয়াম সহ একাধিক আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে। বাধা দিতে গেলে পরিচারিকার পাশাপাশি বাবাকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। এহেন আচরণে আতঙ্কিত বাবা, মা ছেলেকে নিয়ে এসেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। অনেকটা একইরকম সমস্যায় মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে এসেছেন জলপাইগুড়ির সুব্রতবাবু। তাঁর মেয়ের ইচ্ছামতো ঘর সাজানো হয়নি। তাই রাগে সেই মেয়ে ফুলের টব ছুড়ে মাকে রক্তাক্ত করেছে।

বাচ্চাদের এহেন অস্বাভাবিক আচরণকে এক ধরনের মনের অসুখ হিসাবেই চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসকরা। যার পোশাকি নাম লিটল এম্পেরর সিনড্রোম। শহরাঞ্চলে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দিল্লি, কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে উত্তরবঙ্গের ছোটদের মধ্যেও ভালোভাবেই থাবা বসিয়েছে মনের ওই অসুখ। চিকিৎসকরা বলছেন, গত দু-তিন বছরে উত্তরবঙ্গে লিটল এম্পেরর সিনড্রোমে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

- Advertisement -

সন্তান লিটল এম্পেরর সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে কীভাবে বোঝা যাবে? উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শান্তনু দে ব্যাপারটা সহজ করে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, এমনটা হলে বাচ্চা যা বায়না করবে তা তার চাই-ই চাই। দাবি পূরণ না হলেই সে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে। বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করবে। এমনকি বাবা-মায়ের গায়ে হাতও তুলতে পারে। কোনও নিয়মকানুন মানতে চাইবে না। সবসময়ই একটা ডোন্ট কেয়ার আচরণ। যেন বাড়িতে সে যা বলবে সেটাই হবে শেষকথা। তার খেয়ালখুশি মতন চলতে হবে অন্যদের। এর অন্যথা হলেই বিপদ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর জন্য দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা। যৌথ পরিবার থেকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে রূপান্তরও বাচ্চাদের এমন মনের অসুখের অন্যতম প্রধান কারণ। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবা বা মা, কেউই সন্তানদের বেশি সময় দিতে পারছেন না। ফলে সন্তান যখন যা চাইছে তাই দিয়ে খুশি রাখতে চাইছেন। ন্যায্য হোক বা অন্যায্য, সন্তানের দাবি পূরণ বা অফুরন্ত উপহার দেওয়ার অভ্যাস বাবা-মার অজান্তেই সন্তানকে ঠেলে দিচ্ছে অন্য জগতে। তাই যখন চাহিদা মিটছে না তখন বাবা-মায়ে গায়ের হাত তুলতেও পিছপা হচ্ছে না সন্তান।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, যৌথ পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহচর্য বাচ্চার বৌদ্ধিক বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক হয়। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বাচ্চার সময় কাটে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভিতে। এর উপর প্রথম হওয়ার ইঁদুরদৌড় তো আছেই। বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গেও কাটানোর মতো সময় সুযোগ সেভাবে পায় না। ফলে নিজের মনের মধ্যেই সে একটি জগৎ তৈরি করে এবং নিজেকে সেই জগতের অধীশ্বর ভাবে। বড় হলেও সেই মনোভাব বদলায় না। ফলে পরিবারের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ যেখানেই যায় সেখানেই সে কর্তৃত্ব ফলাতে চায়, বেশি ক্ষমতা ভোগ করতে চায়। এমনকি এর জেরে সে অপরাধ জগতের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। নেশার খপ্পরে পড়তে পারে।

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, মোটামুটি ১০ বছর বয়সের পর থেকেই বাচ্চাদের মধ্যে লিটল এম্পেরর সিনড্রোমের প্রভাব লক্ষ করা যায়। আক্রান্ত হলে ১৩-১৪ বছর বয়সে বাচ্চাটি উগ্র হয়ে উঠতে শুরু করে। তারপর যত বয়স বাড়ে উগ্রতা তত বাড়ে। তাই পাঁচ বছর বয়স থেকেই প্রত্যেক বাবা, মায়ের উচিত বাচ্চার বিশেষ যত্ন নেওয়া।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ উত্তম মজুমদার বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তা উদ্বেগের। শান্তনু দের বক্তব্য, একটি চারাগাছ যেভাবে জল, সার দিয়ে বড় করে তুলতে হয়, মা-বাবাকেও সেভাবেই দাযিত্ব নিয়ে সন্তানকে বড় করতে হবে।