জীবন আজও থেমে নেই, বলতে চাইছে প্রিয়র শহর

82

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, কালিয়াগঞ্জ : এ পাড়ায় সব বাড়ির গেটে, দেওয়ালে উড়ছে পদ্ম বা ঘাসফুলের পতাকা। শুধু একটা বাড়ি বাদ দিয়ে। যাবতীয় রংয়ের মাঝে যা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ যেন। হুট করে আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প মনে পড়বে। সেই যে আলিবাবার বাড়িটা চেনার জন্য গেটের দরজায় দাগ দিয়ে গিয়েছিল ডাকাতরা।

কালিয়াগঞ্জের মণিবাগ-শ্রীকলোনির যে ব্যতিক্রমী বাড়ির কথা হচ্ছে, তার বিশাল দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। টিনের দরজার ওপর উড়ছে কংগ্রেসের ঠিক পাঁচটি পতাকা। ভিতরের গাছে লাগানো একটা। পাশের ছোট দরজা বন্ধ। লাগোয়া দেওয়ালের গায়ে মানুষ সমান হাতের ছবি। সঙ্গে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার আর্জি। বাড়ির মালিক প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি আকাশের ঠিকানায় বাসা বাঁধার পর এই প্রথম বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যে। প্রিয় যে একদা এ শহরের বেতাজ বাদশা ছিলেন, তা আর বোঝার উপায় নেই। কটা বাড়ি পরেই বিজেপির সাজানো স্টল।

- Advertisement -

তাঁর বাড়িতে ঢুকলে প্রথমে চোখ চলে যায় বিশাল নাটমন্দিরের দিকে। পিছনের নারকেল গাছটি সব বাড়ির গাছকে ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিমার কাঠামো এখনও রয়েছে। সামনের বেদিতে তিন রংয়ের তিনটি করে জবা, কিছু অপরাজিতা সযত্নে সাজানো। মানে নিঃস্তব্ধ বাড়িতে কেয়ারটেকাররাই এসব করেন নিয়মিত।

তেরো বছর আগের দুর্গাপুজোর নবমীতে সন্ধ্যারতির পর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন প্রিয়। সেখানে মূর্তিপুজো আর শুরু হয়নি এখনও। ঘটপুজো বছর কয়েক হওয়ার পর এখন বন্ধ। কাঠামোপুজোর দৃশ্য জানাচ্ছে, জীবন থেমে থাকে না। পদ্ম এবং ঘাসফুলের পতাকায় ছয়লাপ কালিয়াগঞ্জের রাস্তাও যেমন জানিয়ে দিচ্ছে, জীবন থেমে থাকে না।

বিবেকানন্দের মূর্তি থেকে স্টেশন লাগোয়া লেভেল ক্রসিংয়ে দিকে এগিয়ে একটা ব্যানারেও প্রিয়রঞ্জনের ছবি নজরে পড়ল না। নেতাজি সুভাষ রোডে কংগ্রেসের প্রধান অফিসের নাম রাজীব ভবন। মার্বেলের ফলক জানাচ্ছে, ২০০২ সালে এই ঘরের উদ্বোধন করেছিলেন প্রিয় নিজেই। ভরদুপুরে সেখানে বসে দুজন মাত্র লোক। প্রিয়রই পাড়ার লোক তাঁরা। অরবিন্দ গুহ এবং নাড়ুগোপাল দাস।

উত্তরবঙ্গ ঘুরে ছবির মতো স্পষ্ট, দু-একটি শহর বাদে নির্বাচনে কংগ্রেস বিলুপ্তপ্রায়। দুই ফুলের অমোঘ দাপটের বাজারে যাঁরা এখনও কংগ্রেস ছাড়েননি, তাঁদেরই সম্ভবত পার্টির টান বলে কিছু একটা রয়েছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের সমর্থকরা যেমন ক্লাব ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না, রাজনীতিতে তো এমন নীতিবোধ আর নেই। ফুটবল-প্রিয় প্রিয়রঞ্জনের শহরে এসে মনে হল, রাজনীতিতে মূল্যবোধের টান আজও ফুরোয়নি। সংখ্যাটা অবশ্য অতি নগণ্য। তবু আছে, আছে।

এমনিতে কালিয়াগঞ্জে পঞ্চায়েতে এখন এমন ঘটনা চলছে, যা প্রিয়রঞ্জন বেঁচে থাকলে ন্যূনতম কল্পনাতেও আনা যেত না। মোস্তাফানগর, মালগাঁ পঞ্চায়েতে বিজেপিকে সমর্থন দিচ্ছে কংগ্রেস। হাত ও পদ্ম মিশেছে দুই গ্রামে তৃণমূলকে ঠেকাতে। কংগ্রেসকে ঘিরে যাবতীয় অপ্রিয় প্রশ্নের মাঝে শহরের কংগ্রেস কার্যত হয়ে গিয়েছে ব্লক প্রেসিডেন্ট সুজিত দত্তের পারিবারিক পার্টি।

তবু কীসের আশায় এখনও কংগ্রেস করেন আপনারা? শূন্য কংগ্রেস অফিসে প্রশ্নটা শুনে অরবিন্দবাবু প্রথমে এক সেকেন্ডের মধ্যে মন্তব্য করেন, কংগ্রেস তো আমার কাছে মাতৃসম। পরে সংযোজন, আমরা প্রিয়দার পাড়ার লোক। তার জন্যই পার্টি ছাড়তে পারব না। সেই সত্তর সালে জোড়া বলদ প্রতীক থাকার সময় থেকে পার্টিকে সমর্থন করি। প্রিয়দার ওয়ার্ডে এখনও অনেকে কংগ্রেসকে ভোট দেবে। নাড়ুগোপালের কথা শুনলে মনে হবে, তিনি বলতে চান, এতে অস্বাভাবিকত্ব কোথায়। আমি কংগ্রেস করি চরকা চিহ্ন থাকার সময় থেকে। তাঁদের প্রথম জনের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, ক্লাস টেনে পড়ার সময় প্রিয়বাবুর স্কুলে নাটকে অভিনয়। দ্বিতীয়জনের দাদা ক্ষিতীনের বন্ধু ছিলেন প্রিয়। তাঁদের বাড়িতে রাত কাটিয়েছেন অনেক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে প্রথমবার এসে দাদাকে বলেছিলেন, তোর বাড়িতে মুরগি খাব। রান্না করেছিলেন নাড়ুগোপাল। এসব গল্পের ফাঁকে আক্ষেপ চলে, টাকার অভাবে প্রিয়র ছবি দেওয়া ব্যানার অল্প হয়েছে বলে। আমরা তো নতুন প্রার্থীকে নিয়ে প্রথম মিটিং করলাম প্রিয়দার অফিস ঘরেই।

প্রিয়রঞ্জনের প্রাণের পার্টির এবারের প্রার্থী প্রভাস সরকারকে পাওয়া গেল কলেজপাড়ায় একটি ক্লাবে বাসন্তীপুজোর প্যান্ডেলে। সেখানে এসে নামলেন বোলেরোতে, সঙ্গী বড়জোর তিনজন। ফতেপুর হাইস্কুলের অঙ্ক-বিজ্ঞানের শিক্ষক প্রভাস তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে এসেছেন মাস দুয়েকও হয়নি। সবাই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাচ্ছেন, প্রভাস উলটো কেন হাঁটলেন? শহরে অনেকে বললেন, তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে দলত্যাগ প্রভাসের। কংগ্রেস লুফে নিয়েছে টাকা দেবেন বলে। প্রার্থীর নিজস্ব ব্যাখ্যা, আমি কংগ্রেস পরিবারের ছেলে। বাবা কংগ্রেস করতেন। কংগ্রেসে যেমন পারিবারিক একটা ব্যাপার ছিল, তৃণমূলেও প্রথম দিকে তা ছিল। এখন নেই। তাই দল ছাড়লাম।

প্রিয়রঞ্জনের অফিসঘরে তাঁর বিশাল ছবিটি বড় জীবন্ত। সে ছবিতে মৃদু হাসি লেগে। মাথার ওপর ইন্দিরা গান্ধির একটি ছোট ছবি রাখা। প্রিয়র সেই পুরোনো চেয়ারটি রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য ডাঁই করা চেয়ার। দুপুরে গিয়ে শুনলাম, আগের রাতে এসে দীপা দাশমুন্সি তখনই বেরিয়েছেন প্রচারে। গোয়ালপোখরের দিকে। কোনও এক অজ্ঞাতকারণে প্রিয়ঘরণী এবার সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাচ্ছেন। কালিয়াগঞ্জের প্রচারে বেশি দেখা যায়নি তাঁকে। বাম-কংগ্রেসের কোনও বড় নেতা আপনার প্রচারে এসেছিলেন? জানতে চাইলে প্রভাস যাঁদের নাম করলেন, তাতে অধীর চৌধুরী বাদে বড় নেতা কেউ নেই। প্রিয়র শহর এত গুরুত্বহীন! শুনলাম, অধীর আসার দিন মঞ্চে যাননি দীপা। তবে উনি আমার তিনটি রোড শোতে এসেছেন। সামাল দিলেন প্রভাস।

প্রিয়র বাড়ির দেওয়ালে হাত চিহ্নে ভোট দিন স্লোগানের পাশাপাশি পাঁচ-ছটি দাবি লেখা। বেকার যুবকদের চাকরি। জাত নয়, ভাত চাই। সরকারি লাভজনক সংস্থাগুলো বিক্রি করে দেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ হোক। রেল এবং এলআইসি বিক্রির প্রতিবাদ চাই। সব নিত্যপ্রযোজনীয় জিনিসের দাম কমাতে হবে। কংগ্রেসের সোনালি সময়ে মতো আকর্ষণীয় স্টাইলে দেওয়াল লিখন। কিন্তু স্থানীয় সমস্যা কোথায়? কংগ্রেস প্রার্থী নিজেই বলছিলেন, এলাকার প্রচুর শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে তীব্র সমস্যায়। কেউ দেখার নেই।

সীমান্ত লাগোয়া কালিয়াগঞ্জে অনুপ্রবেশ, পাচার সমস্যা জেলার অন্য শহরের তুলনায় কম। তবু হিন্দুত্বের চোরাস্রোত স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর। কালিয়াগঞ্জের আগের শহর হেমতাবাদের মোড়ে এক দোকানদারের সঙ্গে কথা হল। বাড়ি প্রিয়রঞ্জনের পাড়ায়। চিরদিনের কংগ্রেস সমর্থক। অথচ এবার ঠিক করে ফেলেছেন, মোদির জন্য ভোট দেবেন বিজেপিকে। দ্বিধাহীন, সটান ঘোষণা ভদ্রলোকের। গত দুদিনে অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা চক্কর দিয়েছেন কাছাকাছি শহরে। বিজেপির পক্ষে আদর্শ প্রেক্ষাপট দেখেই তো।

এই প্রবল হাওয়ার বিরুদ্ধে আপনার জেতার সম্ভাবনা কতটা? বাসন্তীপুজোর মণ্ডপের সামনে কংগ্রেস প্রার্থী প্রভাস আত্মবিশ্বাস দেখালেন পুরোনো প্রিয়রঞ্জনের মতোই। অঙ্কের শিক্ষকের ঢংয়ে অতঃপর হিসেব, বাম ভোট নিয়ে কোন পথে জিতবেন। মাইকে তখন কাকতালীয়ভাবে ভেসে আসে পুরোহিতের মন্ত্র।…জয়ং দেহি, যশো দেহি…।
কালিয়াগঞ্জের আকাশ-বাতাস কিন্তু প্রিয়রঞ্জনের পার্টির জয় দেখছে না, যশও নয়।