টি পার্কে কনটেনার ডিপো, রপ্তানির সুবিধা উত্তরবঙ্গ থেকে

342

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : টানা ১২ বছরের টানাপোড়েনের পর নিউ জলপাইগুড়ির টি পার্কে চালু হয়ে গেল ইনল্যান্ড কনটেনার ডিপো (আইসিডি)। তবে নামে কনটেনার ডিপো হলেও প্রাইভেট ফ্রেইট টার্মিনাল (পিএফটি) হিসাবেই কাজ করবে ডিপোটি। অর্থাৎ শুধুমাত্র কনটেনার নয়, যে কোনও ধরনের পণ্য পরিবহণের কাজ হবে আইসিডি থেকে। ফলে এখন থেকে দেশের যে কোনও প্রান্তে বা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য কেনাবেচার জন্য আর কলকাতা বা হলদিয়া বন্দরের উপর নির্ভর করতে হবে না উত্তরবঙ্গ সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ীদের। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের একটি অংশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করবে টি পার্কের আইসিডি। দার্জিলিং বা অসমের চা, মালদার আম বা সিকিমে তৈরি মদ শিলিগুড়ি থেকেই পাঠানো যাবে বিদেশের বাজারে। তবে আপাতত প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রেন লাইনে আন্তঃরাজ্য পরিবহণ শুরু হয়েছে। জানুয়ারি থেকেই চালু হবে ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট।

শুধুমাত্র আইসিডির কাজকর্ম তদারকির জন্য আইসিডি চত্বরেই পৃথক অফিস তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় শুল্ক দপ্তর। ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার একজন আধিকারিককেও নিয়োগ করা হয়েছে। আইসিডি উত্তরবঙ্গ সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের শিল্প বিকাশে নতুন দিক খুলে দিল বলেই মনে করছেন সিআইআই কর্তারা। সংগঠনের উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রুয়াল বলেন, আইসিডি চালু হওয়ায় বলা যেতে পারে, কলকাতা বন্দর শিলিগুড়িতে চলে এল। এতদিন পণ্য কনটেনারে ভরে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে কলকাতা বা হলদিয়া বন্দরে নিয়ে যেত হত। এখন সেই কাজ শিলিগুড়ি থেকেই হবে। ফলে শুধু পণ্য পরিবহণের খরচ কমে যাবে তাই নয়, দীর্ঘ সড়কপথে যাতায়াতের নানা সমস্যা, দুর্ঘটনা, দালালচক্রের হয়রানিও কমে যাবে। এটা আমাদের জন্য একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকবে।

- Advertisement -

চা রপ্তানির সমস্যা মেটাতে বাম আমলে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসজেডিএ) নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন সংলগ্ন সাহুডাঙ্গি এলাকায় টি পার্ক তৈরি করে। সেই তৈরি চা প্যাকেটজাত করে সেখান থেকেই যাতে বিদেশে পাঠানো যায় তার জন্য আইসিডি তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছিল তখন থেকে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ২৯ একর জমির উপর আইসিডির জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে এসজেডিএ। রেলের সঙ্গে চুক্তি হয়। সেই মতো আইসিডির ভেতরে রেললাইন পাতা, প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজও করে রেল। তবে আইনি জটিলতায় কয়েক বছর থমকে ছিল কাজ। পরবর্তী সময়ে একটি বেসরকারি সংস্থা আইসিডি পরিচালনার বরাত পায়। আইনি জটিলতা কাটিয়ে কিছুদিন আগেই ডিপো চালু করে দিয়েছে সেই সংস্থাটি। তবে শুধু চা নয়, আইসিডির পরিকাঠামো ব্যবহার করে সমস্ত পণ্য পরিবহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সংস্থার অন্যতম মালিক অভিরাল জৈন বলেন, আইসিডির জন্য কেন্দ্রীয় শুল্ক দপ্তরের আধিকারিক নিযুক্ত হয়ে গিয়েছে। সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট চালু হয়ে যাবে। আইসিডির লজিস্টিক হাবও উন্নত করা হয়েছে। উত্তর-পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শুভানন চন্দ বলেন, পদ্ধতি মেনেই নিউ জলপাইগুড়ি লাগোয়া পিএফটি চালু হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য সেটি উল্লেখযোগ্য একটি পদক্ষেপ। সূত্রের খবর, আইসিডি থেকে ইতিমধ্যেই কনটেনারবাহী দুটি ট্রেন চলেছে।

চায়ের ক্ষেত্রে আইসিডি সবথেকে বেশি সুবিধাজনক হবে বলে জানিয়েছেন চা ব্যবসায়ীরা। টি পার্কে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু সংস্থা তাদের ইউনিট খুলে চা প্যাকেটজাত করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। সেইসব ইউনিট থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বেই রয়েছে আইসিডি। পার্কের ভেতরে রয়েছে চায়ের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিও। ফলে একই জায়গায় তৈরি চা পরীক্ষা করে, প্যাকেট করে তা রপ্তানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। শিলিগুড়ি টি অকশন কমিটির চেয়ারম্যান এবং টি পার্ক স্টেক হোল্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান কমল তিওয়ারি বলেন, চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে আইসিডি নতুন মাত্রা যোগ করল। অসম সহ উত্তর-পূর্ব ভারত এর ফলে উপকৃত হবে। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হল। নর্থবেঙ্গল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তপন দাস বলেন, উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি আইসিডি নেপাল, ভুটানের জন্যও অত্যন্ত সহায়ক হবে। আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পাবে দেশ। আমরা খুবই খুশি। মালদার বেশিরভাগ আম রপ্তানি হত বাংলাদেশে। গত দুই বছরে নানা কারণে বাংলাদেশে রপ্তানি কমে গিয়েছে। মালদার আম ব্যবসায়ীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে লন্ডনে আম রপ্তানি শুরু করেছেন। তবে সেই আম যাচ্ছে আকাশপথেই। এনজেপির আইসিডি ব্যবহার করে আম বিদেশে পাঠানো যায় কি না সেই বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন আম ব্যবসায়ীরা। মালদা ম্যাঙ্গো গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম সদস্য প্রদীপ সরকার বলেন, আইসিডি নিঃসন্দেহে ভালো প্রকল্প। তবে আম যেহেতু পচনশীল তাই আইসিডি দিয়ে সেটা পাঠানো কতটা সম্ভব তা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে আমাদের সুবিধা হবে। নর্থবেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সুরজিৎ পাল বলেন, আইসিডি চালু হওয়ায় নিশ্চিতভাবে উত্তরে শিল্পের বিনিয়োগ বাড়বে। আরও লজিস্টিক হাব তৈরি হবে। আইসিডিকে কেন্দ্র করে শিলিগুড়ির ব্যবসাও বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।