প্রকাশ মিশ্র , মানিকচক : প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভূতনি সেতুর উদ্বোধন মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে হওয়ার কথা। অথচ তার আগেই ফিতে কেটে সেতুর ওপর দিয়ে হালকা যান চলাচলের সূচনা করে বিতর্কে জড়ালেন মালদা জেলাপরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল। বিভাগীয় মন্ত্রী, জেলা প্রশাসন ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য সাবিত্রী মিত্রকে অন্ধকারে রেখে  বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই মথুরাপুরে ফুলহর নদীর ওপর নবনির্মিত ভূতনি সেতুর ওপর দিয়ে হালকা যান চলাচলের সূচনা করেন সভাধিপতি। ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের সদস্য সাবিত্রী মিত্রও।

২০১৩ সাল থেকে ভূতনি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথমে শুরুতে ব্যয়বরাদ্দ ছিল ১০২ কোটি টাকা। নির্মাণকাজের সূচনা করেছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী গৌতম দেব। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের মাধ্যমে নির্মাণকাজ রূপায়িত হয়েছে। নির্মাণে দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ায় ব্যয়বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ১৪০ কোটি। গত ২০ মার্চ এই সেতুর উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। লোকসভার ভোট ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় উদ্বোধন বা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। সেতুর প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজই সম্পূর্ণ হয়েছে। সংযোগকারী রাস্তা সহ মাত্র ৫ শতাংশ কাজ বাকি। ফুলহর নদীর জল হঠাৎ করেই প্রবলভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই সেতুর ওপর দিয়ে মানুষ হেঁটে পারাপার শুরু করেন।

সাধারণ মানুষের দাবি ছিল, সেতু দিয়ে হালকা যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স এবং পুলিশের গাড়ি পারাপার করতে দিতে হবে। মানুষ হেঁটে পারাপার করলেও এতদিন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ার এবং নির্মাণকারী সংস্থা হালকা যানবাহন পারাপার হতে দেয়নি। অভিযোগ, মালদা জেলাপরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল  এবং  তদারকি সংস্থা মালদা পিডব্লিউডির (রোডস) আধিকারিক জগন্নাথ সামন্তের  উদ্যোগে স্বাধীনতা দিবসের দিন এই সেতুর ওপর দিয়ে হালকা যানবাহন চলাচলের সূচনার পরিকল্পনা করা হয়।  গৌরচন্দ্র মণ্ডল ফিতা কেটে এই সেতু দিয়ে হালকা যানবাহন চলাচলের সূচনা করেন। তিনি বলেন,  স্বাধীনতা ও রাখিবন্ধন দিবসে এক নতুন করে স্বাধীনতার স্বাদ পেলেন ভূতনি সহ মানিকচকবাসী।

অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য সাবিত্রী মিত্র সহ প্রশাসনের সমস্ত আধিকারিককে  অন্ধকারে রেখে সেতুর সূচনা হয়ে যাওয়ায় তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এব্যাপারে সাবিত্রী মিত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার চেষ্টায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় ভূতনি সেতুর অনুমোদন হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে এই সেতুর উদ্বোধন হবে। তার আগে কি করে সভাধিপতি ফিতা কেটে সেতুর ওপর দিয়ে হালকা যান চলাচলের সূচনা করলেন, তা বুঝতে পারছি না। জেলাশাসক জানেন না। বিডিও জানেন না। বিভাগীয় মন্ত্রী জানেন না। অথচ সূচনা হয়ে গেল। বিষয়টি আমি  রাজ্যস্তরে জানিয়েছি। এইভাবে চললে দল ও প্রশাসন দুটোই মুখ থুবড়ে পড়বে।

ভূতনি সেতু নির্মাণের দাযিত্বে থাকা নির্বাহী বাস্তুকার জগন্নাথ সামন্ত বলেন, এটা  সেতুর উদ্বোধন নয়। সাধারণ মানুষ গত একমাস ধরেই সেতুর ওপর দিযে যাতায়াত করছেন। তাঁদের দাবি ছিল, বাইক সহ হালকা যানবাহন যেতে এবং আসতে দিতে হবে। এই নিয়ে প্রতিদিন নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বচসা হচ্ছিল। তাই সভাধিপতির সঙ্গে আলোচনা করে হালকা যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফিতা কাটার ঘটনা হয়নি। সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, পূর্তদপ্তরেরই নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। তিনি এদিন বেলা দশটার দিকে জানতে পারেন এবং তিনিও সঙ্গে যাবেন বলে জানান। যেহেতু এই উদ্যোগ জেলাপরিষদের নয়, তাই এর দায়দাযিত্ব আমার নয়। আমি শুধু সঙ্গে গিয়েছি মাত্র। হঠাৎ করে হওয়ায় কোথাও যোগাযোগ করতে পারিনি। সেখানে কোনোরকম ফিতে কাটার ঘটনা হয়নি। কেন না সেতু উদ্বোধন করার ধৃষ্টতা আমার নেই। এটি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে উদ্বোধন হবে।

এলাকার পিন্টু দাস, দুলাল মণ্ডল, জামাল খান, কৈলাস মণ্ডল, সুনন্দ মজুমদারের বক্তব্য, সেতু দিয়ে হালকা যানবাহন চলাচলের সূচনা হওয়ায় এলাকার মানুষের উপকার হবে। এটা উদ্বোধন নয়। মানুষের অসুবিধা হচ্ছিল। সাইকেল, বাইক নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।  এই ভালো কাজ নিয়ে এত হইচইয়ের কিছু নেই। অন্যদিকে সুভাষ যাদব, বলরাম ঘোষ, সুবল মণ্ডলদের বক্তব্য, সেতু উদ্বোধনের বিষয়টিকে হালকাভাবে নিলে হবে না। স্বাধীনতার পর এত বড়ো একটা কাজ হয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে গোটা রাজ্যের মানুষকে জানিয়ে উদ্বোধন হওয়া উচিত। তার আগেই মিনি উদ্বোধন করে আসল উদ্বোধনের মাধুর্যটাই মাটি করে দেওয়া হল। এটা ঠিক নয়।