ইতিহাস ঢাকল মালদা মেডিকেলের প্রতীক্ষালয়

কল্লোল মজুমদার, মালদা : মালদা মেডিকেল কলেজ চত্বরে রয়েছে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ। যে সৌধগুলি নীলকুঠি সাহেবদের সমাধিস্থল। ওই সমাধিস্থলগুলি চরম অবহেলায় পড়েছিল এতদিন। এবার অবহেলার সঙ্গে যোগ হয়েছে ইতিহাসকে অবহেলা করা। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই ঐতিহাসিক সমাধিক্ষেত্রের সামনে গড়ে তুলেছেন প্রতীক্ষালয়। যা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার শিক্ষাবিদরা।

ইতিহাসের পাতা উলটালে দেখা যায়, মেডিকেল কলেজ চত্বরে একসময় ছিল রাজা রায়চৌধুরীর একটি পুকুর। যে পুকুরপাড়ে গড়ে উঠেছিল নীলকুঠি। সেই কুঠিটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী। উইলিয়াম ফ্রাঙ্কলিন তাঁর সফরের ডায়ারিতে ১৮১০ খ্রীস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর এই কুঠির কথা লিখেছেন। আবার হান্টার সাহেব ১৮৭০ খ্রীস্টাব্দে তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, এই কুঠির অধীনে পাঁচ হাজার বিঘা জমিতে নীলচাষের ব্যবস্থা করেছিলেন। তৎকালীন ৩০ হাজার টাকা মূলধন লাগিয়ে ২৫০ মন নীল উৎপাদন করে ৬৭ শতাংশ লাভ করেছিলেন। সেই সময় সাহেবদের ছটি সমাধি তৈরি হয়েছিল। যা দীর্ঘদিন থেকে অবহেলিত। ঝোপঝাঁড়ে ঢেকে গিয়েছে পাঁচটি সমাধি। একটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। মালদার ইতিহাসপ্রেমী মানুষের দাবি ছিল, ইতিহাস সমৃদ্ধ এই সমাধিগুলি সংরক্ষণ করে মানুষের সামনে তুলে ধরা হোক। যাতে মানুষ ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে পারেন।

- Advertisement -

কিন্তু মানুষের সেই দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে সমাধিগুলির সামনে গড়ে তোলা হল একটি পাকা প্রতীক্ষালয়। যা নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শক্তিপদ পাত্র বলেন, সিঙ্গাতলার দিক দিয়ে যখনই হাসপাতাল চত্বরে গিয়েছি, তখনই নজরে পড়ত সমাধিগুলি। যা মালদার মানুষের কাছে একটি আবেগের বিষয়। আমরা দীর্ঘদিন থেকে ওই সমাধিক্ষেত্রটি সংরক্ষণের দাবি তুলেছিলাম। এখন দেখছি ওই সমাধিক্ষেত্রটির সামনে প্রতীক্ষালয় গড়ে তোলা হয়েছে। আইন বলে, ঐতিহাসিক কোনও সৌধের সামনে স্থায়ী কিছু গড়ে তুলতে হলে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। কিন্তু তা করা হয়নি। যা থেকে প্রমাণ, যথেচ্ছ নির্মাণের আর কোনও বাধা থাকছে না। বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া উচিত, না হলে আগামী প্রজন্ম মালদা জেলার ইতিহাস জানতে পারবেন না।

গৌড় কলেজের অধ্যাপক ঋষি ঘোষ বলেন, উইলিয়াম উইলসন হান্টারের ১৮৭০ সালে প্রকাশিত কালজয়ী আকরগ্রন্থ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল-এ ইংরেজবাজার নীলকুঠির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। উইলিয়াম ফ্রাঙ্কলিনের ভ্রমণ বিবরণীতেও এই কুঠিকেন্দ্রিক জীবনযাপনের ছবি পাওয়া যায়। এই সমাধিক্ষেত্রটি ইতিহাসের সেই বিস্মৃত অধ্যায়ে সাক্ষ্য বহন করে, যা সম্পর্কে অসচেতনতা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। তবে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সংরক্ষণ হলে আগামী প্রজন্ম অন্তত ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ পেত। ইতিহাসের মুখ রোগী প্রতীক্ষালয়ে বেঞ্চ ঢেকে দিল। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা আমাদেরই।