মমতার উন্নয়ন বনাম নেতাদের দুর্নীতি, কোচবিহারে হিসেব হবে অনেক কিছুর

538
ফাইল ফটো

কোচবিহার ব্যুরো : ঘটনাটা কেউ ভোলেননি। একদিন সকালে ঢাকঢোল পিটিয়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন বাম আমলের মন্ত্রী ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা পরেশ অধিকারী। আর তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসএসসি-র নিয়োগ হয়ে গেল। রাতারাতি তালিকা বদলে এক নম্বরে নাম এল পরেশবাবুর মেয়ে অঙ্কিতার। চাকরিও হয়ে গেল। সেটাই সম্ভবত জেলায় এসএসসি-র শেষ নিয়োগ। পরেশবাবুকে দলে এনে লোকসভায় প্রার্থী করে কী লাভ হয়েছিল সেটা তো লোকসভার ফলাফলেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বস্তুত, তারপর থেকে পরেশবাবুকে কোথায় পুনর্বাসন দেবেন, নাকি লুকিয়ে রাখবেন, সেটাই ঠিক করে উঠতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু ক্ষতিটা যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এসএসসি দিয়ে প্যানেলে নাম তুলে চাকরি না পাওয়া কয়েক লক্ষ শিক্ষিত ছেলেমেয়েকে চিরশত্রু বানিয়ে ফেলেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

এসবের কি দরকার ছিল? এমন প্রশ্ন এখন দলের অন্দরেও। সামনের বছর বিধানসভা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে কোচবিহারে এ ধরনের অগুনতি প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তৃণমূলকে। এককথায়, এমন অনেক অপ্রিয় প্রশ্নের জবাব চেয়ে ভোট হবে কোচবিহারে। যেমন ধরুন, প্রতিবছর নিয়ম করে কয়েক মাস আলু-পেঁয়াজের কালোবাজারি। যে কৃষক জমি থেকে আলু তুলে পাঁচ টাকা কেজিতে বেচলেন তিনি যখন বাজারে গিয়ে সেই আলুর দর ৩০ টাকা কেজি শোনেন, তখন তাঁর হিসাব মেলানোর মতো অঙ্ক তো তৃণমূল নেতাদের জানা নেই। আবার জেলায় কবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হয়েছে, তা বোধহয় তৃণমূলের জেলা সভাপতিও মনে করতে পারবেন না। আর কাটমানি ইস্যুকে তো সামনে এনেছেন স্বযং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যে বিজেপির পায়ের তলায় অনেকটা জমি জোগাড় করে দিয়েছে এই কাটমানি পর্ব। রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে টাকা ফেরাচ্ছেন, এমন ঘটনা দেশে আর কোথাও ঘটেছে বলে তো মনে পড়ে না।

- Advertisement -

এবার দলটার অন্দরে চোখ রাখা যাক। মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের সঙ্গে জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়ের বিরোধ থেকে এখন দুর্গন্ধ ছাড়ছে। তারপর হিতেন বর্মন-সায়ের আলি মিয়াঁ, পার্থ-পরিমল বর্মন, উদয়ন-মীর হুমায়ুন কবীর, অর্ঘ্য রায়প্রধান-লক্ষ্মীকান্ত সরকার, বিনয় বর্মন-কল্যাণী পোদ্দার, তৃণমূলে গোষ্ঠী লড়াইয়ের শেষ নেই। সবচেয়ে বিপদের কথা, এঁরা দলের ক্ষতি করেও বিরোধী গোষ্ঠীর প্রার্থীকে হারাতে সক্রিয়। এমনকি একসময় তাঁকে পিছনে ঠেলে বিষ্ণুব্রত বর্মনকে জেলা যুব সভাপতি করায় এখন অভিজিৎ দেভৌমিকের মতো যুবনেতাও জেলা সভাপতিকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছেন না। গোষ্ঠী সংঘর্ষের যে কালচার জেলায় তৃণমূল আমদানি করেছে তা বাম আমলে ফরওয়ার্ড ব্লক-সিপিএমের খেয়োখেয়ি করা নেতারাও ভাবতে পারবেন না। আর তার জেরে প্রতিদিন বোমাবাজি, গুলির লড়াই দেখে বিরক্ত সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদ করায় অনেকের নামে মিথ্যা মামলা পর্যন্ত সাজানো হয়েছে। পুলিশি হয়রানি তো আছেই। এসব করে দলটাই হেরে গেলে তাঁরা নিজেরা কোথায় দাঁড়াবেন, তা বোধহয় তৃণমূল নেতারা জানেন না। তৃণমূলের এক পুরোনো কর্মী আক্ষেপ করছিলেন, দলে নেতার থেকে এখন কালিদাস বেশি।

তা বলে কি তৃণমূলের জমানায় সব খারাপ হয়েছে জেলায়? তা বোধহয় নয়। যে মেয়েরা হেঁটে স্কুলে যেত সে তো একটা সাইকেল পেয়েছে। ছেলে ইউনিফর্ম পরে, জুতো পায়ে স্কুলে যাচ্ছে, এমন ছবিটা দেখা তো অনেক খেতমজুরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা তো করেছেন। দু’টাকার চাল-গম থেকে কোচবিহার মেডিকেল কলেজ, সাগরদিঘি ঘাট সেতু, জয়ী সেতু, আইটিআই, পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অনুমোদন- জেলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের পাল্লা নেহাত ফেলনা নয়। রাজবংশী বোর্ড করে তাঁদের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। কিন্তু সেই বোর্ডের কর্মকর্তাদেরই তো সুষ্ঠু, ধারাবাহিক পরিকল্পনা নেই। শুধু রাজ্যের কাছ থেকে টাকা চাওয়া ছাড়া এইসব বোর্ড বা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কর্তারা যে কাজ কতটা করেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ আছে। জেলার একটা বড় অংশের ভোটার মনে করেন, জেলার ফড়ে নেতারা মাঝখানে কমিশন না খেলে, রাজ্য সরকারের প্রকল্পের সুফল তৃণমূলস্তর পর্যন্ত পৌঁছালে তৃণমূলের আখেরে ভালোই হত।

প্রশ্ন হল, এসব সুযোগ বিজেপি কতটা নিতে পারবে? তাদের তো জেলার নয়টা বিধানসভা আসনে প্রার্থী দেওয়া দূরের কথা, বলার মতো ন’জন নেতাই নেই। আর ভোট যদি পেশিশক্তির লড়াই হয় তাহলে দিনহাটা আর তুফানগঞ্জ ছাড়া আর কোথাও তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপি এঁটে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সত্যি কথা বলতে, জেলায় বিজেপির লড়াকু মুখ বলতে নিশীথ প্রামাণিক। তিনি তো তৃণমূল থেকে আসা। জেলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে উঠে আসা বিজেপি নেতা কোথায়? তৃণমূল জমানার ব্যর্থতা, দুর্নীতিকে ইস্যু করে আন্দোলন করার মতো নেতা বিজেপি জেলায় অন্তত এখনও পায়নি। এমনকি নিশীথকেও সেই ভূমিকায় দেখা যায়নি। সাংসদকে জেলা রাজনীতিতে সক্রিয় করার সদিচ্ছা অন্তত এখনও বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের নেই। ফলে ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় দিনহাটা ও কোচবিহার-১ ব্লকের কিছু পকেটে ভোট টানলেও জেলায় বিজেপিকে জিতিয়ে আনার ক্ষমতা সাংসদের আছে কি না সন্দেহ। নিশীথের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ- দলের নেতারাই তাঁর দেখা পান না। তাছাড়া নিশীথ প্রামাণিক কিন্তু এখনও কেন্দ্রের কাছ থেকে কোচবিহার জেলার জন্য একটা সুতোও আদায় করে আনতে পারেননি। ফলে তাঁর ওপর কোচবিহারের মানুষ বিধানসভা ভোটে আস্থা রাখবেন কেন, এ প্রশ্ন থাকবেই। অগত্যা, বিজেপির ভরসা সেই পুরোনো মেরুকরণের তাস। অনন্ত মহারাজ ও রাজবংশী ভোটের অঙ্ক কষা। কোচবিহারের ২৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ যে তাদের দিকে আসবে না, তা বিজেপি নেতারা জানেন। তাই মতুয়া বা নমশূদ্রদের ভোট এখন তাদের বড় ভরসা। তবে আরএসএস বুথস্তর থেকে যেভাবে সংগঠন সাজাচ্ছে তার কিছুটা সুফল বিজেপি পেতে পারে। লোকসভা ভোটে মোদি ম্যাজিকে যে কাজ হয়েছিল বিধানসভা ভোটে তা যে আবার হবে, এমন আশা না করাই ভালো। তাই শুধু কোচবিহার নয়, গোটা উত্তরবঙ্গে লোকসভায় বিজেপি যে অঘটন ঘটিয়েছিল সেটার পুনরাবৃত্তি আর হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। দিল্লির ফলাফল দেখে রাজ্য বিজেপির নেতারা সেই শিক্ষাটা নিতে পারেন আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে প্রত্যাশার পারদ কিছুটা উঠতে পারে।