তমালিকা দে, শিলিগুড়ি :  একসময় কুলিরাই ছিলেন স্টেশনের নায়ক। তাই তাঁদের নিয়ে তৈরি হয় আশির দশকের বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা কুলি। যেখানে একজন কুলির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। স্টেশনে ট্রেন আসতেই যাত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিযে ব্যস্ত হযে পড়তেন কুলিরাও। তবে এনজেপিতে এখন কুলিদের সেই ব্যস্ততা আর আগের মতো নেই। বরং বেশির ভাগ সময়টাই কাটছে স্টেশনের এদিকে-ওদিকে বসে থেকে। রেলের খাতা-কলমে পেশার পরিবর্তন না ঘটলেও যাত্রীদের কাছে তাঁদের ভূমিকা বদলেছে অনেকটাই। এখন স্টেশনে য়াত্রীদের মালপত্র বহন করা যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, শৌচালয়, টিকিট কাউন্টার, প্রতীক্ষালয় কোনটি কোনদিকে তা যাত্রীদের দেখিযে দিযে দিন কাটছে কুলিদের। যার ফলে এখন সংসার চালাতে রীতিমতো হিমসিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ইতিমধ্যে নিজেদের অবস্থার কথা জানিয়ে এনজেপি স্টেশনের কুলি সংগঠনের পক্ষ থেকে  রেলমন্ত্রীকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এনজেপি স্টেশন ও শিলিগুড়ি জংশনে য়াত্রীদের উপর নির্ভর করে সংসার চলে বহু কুলির পরিবারের। একসময়ে  রমরমা এই জীবিকা বর্তমানে  চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে তাঁদের কপালে। এমনকি লিট্টি-ও ঠিকমতো মুখে ওঠে না অনেক কুলির। ইতিমধ্যেই এনজেপিতে দুশো আশি থেকে কুলির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে একশোতে। শিলিগুড়ি জংশনে কুলির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ষাটে।

বর্তমানে এই অবস্থার জন্য প্রযুক্তিকেই দায়ী করেছেন কুলিরা। ইতিমধ্যেই যাত্রীদের সুবিধার্থে এনজেপি স্টেশনকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক নানা ব্যবস্থায় সাজিযে তোলা হয়েছে। এসকালেটার থেকে শুরু করে লিফট সবই রয়েছে স্টেশনে। এসবের জন্যই মালবহনে কদর কমেছে কুলিদের। পরিস্থিতি বুঝে ইতিমধ্যেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। আর যাঁরা কোনো উপায় না পেয়ে এই পেশায় থেকে গিয়েছেন তাঁদের রুজিরোজগারই কঠিন হযে দাঁড়িয়েছে। স্টেশনের কুলি সংগঠনের এক মুখপাত্র বলেন, আগে মালপত্র বহন করে আমরা দিনে তিন-চারশো টাকা আয় করতাম। রেল কর্তপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী এখন চল্লিশ কেজি মালবহনের জন্য পারিশ্রমিক পাই আশি টাকা এবং হুইলচেয়ারে করে কাউকে নিয়ে এলে সেক্ষেত্রে পাওয়া যায় দেড়শো টাকা। তবে স্টেশনে মডার্ন এত সুবিধে থাকায় এখন বেশিরভাগ যাত্রীই নিজের মালপত্র নিজে বহন করে থাকেন। এমনও দিন যায় এক টাকাও আয় হয় না। দার্জিলিং মেল, রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো ভিআইপি ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু আমরা বেশির ভাগই বসেই সময় কাটাই।

স্টেশনে ত্রিশ বছর ধরে কুলির কাজ করছেন ধরমবীর সিং। তাঁর কথায়,বংশপরম্পরায় এই পেশায় রয়েছি। তবে আয় এখন আর তেমন নেই। কিন্তু পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল না। এই কাজ করেই মাসে কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্ত একসময় আয় করেছি। কিন্তু এখন পর্যটন মরশুমেও দশ হাজার টাকা আয় নেই। সংসার চলছে কোনোরকমভাবে।

অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে কুলি ইউনিয়ন-এর এনজেপি স্টেশনের প্রাক্তন সম্পাদক মহম্মদ সওকত আলি বলেন, এগারো বছর ধরে বংশপরম্পরায় আমি এনজেপি স্টেশনে কুলির কাজ করছি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছেন। রেলমন্ত্রীর কাছে আমরা পুরো বিষয়টি জানিয়ে সংগঠনগতভাবে চিঠি পাঠিয়েছি।