যৌনকর্মীদের জীবনে ভোরের আলো ঊষা

364

বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা : লকডাউন সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যেও চূড়ান্ত আর্থিক সংকট ডেকে এনেছে। সরকারিভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া রাজ্যের যৌনকর্মীরা এখন রোজগার থেকে বঞ্চিত। তবুও তাঁদের জীবন এখনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠেনি ঊষা-র কল্যাণে। যৌনকর্মীদের সমবায় সমিতির নাম ঊষা। দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির পরিচালনায় এই সমবায় এশিয়ার মধ্যে যৌনকর্মীদের তত্ত্বাবধানে সর্ববৃহৎ বহুমুখী সমবায় সমিতি। এই সমবায় সমিতি স্বল্পমূল্যে যৌনকর্মীদের কাছে নানা নিত্যসামগ্রী বিক্রি করে। আবার এই সমিতি যৌনকর্মীদের কাছে ব্যাংকের সমান। টাকা জমা রেখে এই সমিতি থেকে যেমন যে কোনও ব্যাংকের থেকে বেশি সুদ পাওয়া যায়, তেমনই অনেক কম সুদের হারে এবং কম ঝঞ্ঝাটে ঋণ মেলে। তাই ১৯৯৫ সালে গঠিত ঊষা রাজ্যের যৌনকর্মীদের কাছে এক পরম আশ্রয়।

দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় অনেকে এখান থেকে ঋণ নিয়েছেন। টাকা জমা দেওয়া বা ঋণ নেওয়া, কোনও কারণেই এখানে কাউকে আসতে হয় না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিদিন টাকা সংগ্রহ করে আনেন সমিতির কর্মীরা। এঁরা যৌনকর্মীদেরই সন্তান। আবার আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ঋণ তাঁরাই ঘরে পৌঁছে দেন। এই খারাপ সময়ে প্রতিদিন প্রতি মাসে প্রতি যৌনকর্মীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য ঊষার তরফে নির্মলা সীতারামনের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হলেও কোনও জবাব আসেনি। তবে হাল ছেড়ে দেয়নি এই সমবায়। ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে যৌনকর্মীদের সমবায়। তালিকা পাঠাচ্ছে দুঃস্থ যৌনকর্মীদের। ঊষার ম্যানেজার শান্তনু চট্টোপাধ্যায় জানালেন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের তরফে মাথাপিছু ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা সরাসরি চলে যাচ্ছে দুঃস্থ যৌনকর্মীদের কাছে। ইতিমধ্যে রাজ্য সমবায় ব্যাংকের কাছে সমবায় সমিতির তরফে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ১৪ জন সদস্যকে নিয়ে গঠিত ঊষার সদস্য সংখ্যা এখন ৩১ হাজারে পৌঁছেছে। একসময় এই সমবায়ে দৈনিক জমার পরিমাণ আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকায় পৌঁছেছিল। শান্তনুবাবু জানালেন, ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর খদ্দের আসা কমে গিয়েছে। ফলে যৌনকর্মীরা আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিলেন। এখন দৈনিক জমার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। লকডাউনে ব্যবসা বন্ধ থাকায় অনেকেই এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছেন। শুরুতে এই সমবায় সমিতির রেজিস্ট্রেশন করতে বেগ পেতে হয়েছিল। সরকারের বক্তব্য ছিল, এটি অনৈতিক পেশা। ঊষার প্রাণপুরুষ ডাক্তার স্মরজিৎ জানা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, আমি ডাক্তার, আমি পরিষেবা দিই। যৌনকর্মীরা চুরি বা ডাকাতি করেন না। তাঁরাও পরিষেবা দেন। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সমবায়মন্ত্রী ছিলেন সরল দেব। শেষমেশ সরকার ঊষাকে স্বীকৃতি দেয়। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ঊষার পাসবইকে প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণ করায় তার ভিত্তিতে যৌনকর্মীরা ভোটার কার্ড, র‌্যাশন কার্ড পাচ্ছেন। যৌনকর্মীদের বক্তব্য, এখান থেকেই আমাদের জীবনের চাকা ঘুরে গিয়েছে। আগে বাবুরা আমাদের দৈনিক রোজগার কেড়ে রেখে দিত। এদিক-ওদিক থেকে ধার করতে হত। এখন ভোটাধিকার পেয়ে যাওয়ায় আমাদের জোর বেড়েছে। দৈনিক রোজগারের টাকা ঊষাতেই জমাই। দরকার মতো ঋণ নিই। এক যৌনকর্মী বলেন, ঊষা থেকে আমি মোট ৩ বার ঋণ নিয়েছি। প্রথমে জমি কেনা, তারপর বাড়ি করা এবং শেষে মেয়ের বিয়ে জন্য ঋণ নিয়েছি। ঊষাই আমার জীবনে ভোরের আলো এনে দিয়েছে।

- Advertisement -