প্রতিযোগিতা নয়, মহামারি নির্মূলে চাই সমন্বয়

এই মহামারি এবং আর্থিক মন্দার ছায়া গোটা বিশ্বের ওপরে পড়েছেতাই এককভাবে কোনও দেশের উদ্যোগ এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার পক্ষে পর্যাপ্ত নয়ভাইরাস কোনও দেশের সীমান্ত বোঝে নাধনী দেশ মানেই সেখানে সংক্রমণ হবে না, এই ধারণাটা ক্রমশ ফিকে হচ্ছেনিউজিল্যান্ড এর সবচেয়ে বড় উদাহরণলিখেছেন বিল মেলিন্ডা গেটস

চারদিকে যখন ঘোর অনিশ্চয়তা। কিন্তু দুটো ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। প্রথমত, যত দ্রুত সম্ভব আমরা কোভিড মহামারির শেষ দেখতে চাই। দ্বিতীয়ত, যত বেশি সম্ভব প্রাণ আমরা বাঁচাতে চাই। সেই লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রতিষেধক তৈরির দৌড়ে শামিল হয়েছেন। কিছু দেশ অবশ্য গবেষণা শেষ হওয়ার আগেই প্রতিষেধক কেনার চুক্তি করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু গবেষণা ক্ষেত্রে যদি সমন্বয় না গড়ে আমরা এগোই, তাহলে এই মহামারি নিকট ভবিষ্যতে শেষ তো হবেই না, বরং আরও ভয়ংকর চেহারা নেবে। আমাদের ফাউন্ডেশন থেকে নর্থ-ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবস ল্যাবের মডেলারদের দুটি পৃথক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। প্রথম পরিস্থিতি হল উচ্চ আয়ে ৫০টি দেশ প্রতিষেধকের প্রথম ২০০ কোটি ডোজ করায়ত্ত করেছে।

- Advertisement -

দ্বিতীয়টি হল, সারা বিশ্বের প্রতিষেধক যেন সমানভাবে বণ্টন হয়, যা কোনও দেশের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। মোবস ল্যাব বহু বছর ধরে বিশ্বে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ছড়ানোর মডেল তৈরি করে আসছে। কোভিড ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে তাই ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে এই ল্যাবের জুড়ি মেলা ভার। তবে এবারের চ্যালেঞ্জটা অন্যরকম। সেটা হল, এই সংক্রমণ কোন দিকে মোড় নেবে, সেই বিষয়ে অজানা ফ্যাক্টর আছে একাধিক। সংক্রমণ নতুন বলে পুরোনো তথ্য হাতড়ে কিছু খুঁজে পাওয়ার সুয়োগ নেই। তাই মোবস ল্যাব বিভিন্ন কাউন্টার ফ্যাকচুয়াল পরিস্থিতি তৈরি করে দেখার চেষ্টা করেছে যে, ২০২০ সালের মার্চের মাঝামাঝি প্রতিষেধক বাজারে এলে কী হতে পারত।

যেহেতু বাস্তবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর কোনও প্রতিষেধক নেই, তাই এই গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু বিষয় আগাম অনুমান করে তার ওপর ভিত্তি করে এগোতে হয়েছিল। যেমন, একটি অনুমান হল, প্রতিষেধকের একটি ডোজ প্রয়োগের পর তা ৮০ শতাংশ কার্যকরী থাকবে। দ্বিতীয়টি, প্রতি সপ্তাহে সাড়ে ১২ কোটি ডোজ দেওয়া যাবে। তবে, এই গবেষণাগুলির ফলাফল পাওয়া গিয়েছে ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। যে দুটি পরিস্থিতিকে ধরে এই গবেষণা এগিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, যদি ২০২০ সালের মার্চ মাসেই প্রতিষেধক চলে আসত এবং তার বণ্টনে স্বচ্ছতা থাকত, তাহলে এবছরের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬১ শতাংশ মৃত্যু এড়ানো যেত। কিন্তু যদি ধনী দেশগুলির কাছে আগে প্রতিষেধক চলে আসত, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে দুগুণের বেশি মানুষ মারা যেত এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশে ছড়িয়ে পড়ত।

চার্ট করে দেখানো হচ্ছে, প্রতিষেধক বিলির পদ্ধতি কীভাবে মৃত্যুসংখ্যা কমানোয় ভূমিকা পালন করে। নর্থ-ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, যদি মার্চ মাসের মাঝামাঝি একটি প্রতিষেধক চলে আসত, তা হলে ধনী দেশগুলিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে তা প্রদান করা হলে প্রায় দুগুণ বেশি প্রাণ বাঁচানো যেত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন ধনী দেশের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, দ্বিতীয় পরিস্থিতিটা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। আমরা বুঝি, কোন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে প্রতিষেধক উৎপাদনের পাকা কথা বলে রাখছে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি যেমন সরকারের, তেমনই সরকার বিনিয়োগ করলে গবেষণার ধার ও ভার বাড়ে। উৎপাদনকেন্দ্র তৈরির খরচও উঠে আসবে।

এই মহামারি এবং আর্থিক মন্দার ছায়া গোটা বিশ্বের ওপরে পড়েছে। তাই এককভাবে কোনও দেশের উদ্যোগ এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার পক্ষে পর্যাপ্ত নয়। ভাইরাস কোনও দেশের সীমান্ত বোঝে না। ধনী দেশ মানেই সেখানে সংক্রমণ হবে না, এই ধারণাটা ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের কথা ধরা যাক। সংক্রমণটিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিল। দেশটায় জীবন ফিরছিল স্বাভাবিক ছন্দে, এমনকি ভরা মাঠে রাগবি খেলারও আয়োজন করা হয়েছিল। তার পরেও সে দেশের অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছে, করোনাও ফিরে এসেছে আর নিউজিল্যান্ডকে আবার শাটডাউনের পথে হাঁটতে হয়েছে। আমরা দুজনই সুস্বাস্থ্যের সাম্যের পক্ষে সোচ্চার। আমাদের ফাউন্ডেশন এমন সব রোগের সঙ্গে লড়াই করে, যেগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ধনী দেশগুলির সরকারের এমন সব গরিবের রোগ নিয়ে ভাবার ফুরসত নেই।

কিন্তু কোভিড-এর ক্ষেত্রে সমস্যাটা উলটো। এখানে ধনী দেশগুলোই এই সংক্রমণের আঁতুড় হয়ে উঠেছে। তাই দরিদ্র দেশগুলির সমস্যা হয়তো পিছনের সারিতে চলে যাবে। তবে এখন মানবিক দিক থেকে ভাবা এবং আত্মকেন্দ্রিক ভাবনার কোনও বিভেদ নেই। কোভিড-এর প্রতিষেধক বণ্টনে স্বচ্ছতা থাকলে দ্রুত এই মহামারি শেষ করা যাবে। প্রতিষেধক তৈরিতে একটা মাস বাঁচানো মানে বিশ্ব অর্থনীতির আনুমানিক ৫০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি বাঁচানো। গুটিকয়েক দেশে প্রতিষেধক পৌঁছালে হয়তো তাদের অর্থনীতির হাল কিছুটা ফিরবে। কিন্তু এটা অসম্ভব যে, একদিকে বিশ্বে মহামারি ছড়িয়ে পড়বে আর ওই দেশগুলির অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি হবে। কারণ পরিস্থিতি না ঠিক হলে সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা যাবে না। আন্তর্জাতিক উড়ানও থমকে থাকবে।

তা হলে কার্যকরী এবং ন্যায়সংগত পদক্ষেপ কীরকম হওয়া উচিত? আমাদের ফাউন্ডেশন এমন একটি উদ্যোগকে সাহায্য করছে, যেখানে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা একত্রে রোগনির্ণয়, চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করা এবং প্রতিষেধক তৈরি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। যে সমস্ত দেশ কোভ্যাক্স নামে এই উদ্যোগে প্রতিষেধক তৈরিতে শামিল হয়েছে, প্রতিষেধকটি বেরোনোর পর তারা প্রত্যেকে নিজেদের দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার জন্য সেগুলি পাবে। অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো বিষয় হল, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এই কোভ্যাক্স উদ্যোগের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। বহুপাক্ষিক সমাধানের খোঁজে উদ্যোগ আস্তে আস্তে গতি পাচ্ছে। কিন্তু আরও বেশি সংখ্যক ধনী দেশকে আমাদের পাশে চাই। যেসব দেশ কোভ্যাক্স উদ্যোগের সঙ্গে এখনও যুক্ত হয়নি, তাদের অন্য কোনও ভাবে এমন বিশ্বব্যাপী উদ্যোগের শরিক হওয়া উচিত।

ধনী দেশগুলি তাদের রিজার্ভ করা প্রতিষেধকের থেকে কিছু সংখ্যক ডোজ নিম্ন আয়ের দেশগুলির জন্য সরিয়ে রাখতে পারে। ঠিক যেমনটা করা হয়েছিল এইচ১ এন১ মহামারির সময়ে অথবা তারা গাভি, দ্য ভ্যাক্সিন অ্যালায়েন্সকে অর্থসাহায্য করতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশগুলিকে প্রতিষেধক তৈরির জন্য সাহায্য করার দুদশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই সংস্থার। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলিকেও প্রোডাক্টের দাম এমন রাখতে হবে যাতে এই বিপদের সময়ে সেগুলি সকলের সাধ্যের মধ্যে থাকে। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বব্যাপী সহযোগিতাই এই বিপদ থেকে বেরোনোর একমাত্র পথ। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারগুলিকে বুঝতে হবে, এটা কোনও প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে জিততে গেলে একজনকে হারাতেই হবে। এটা একটা যৌথ প্রচেষ্টা, যেখানে আমাদের সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

(লেখকরা গেটস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার)