ঘরবন্দি থেকেও রেহাই নেই করোনায়

148

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি শহরের দেশবন্ধুপাড়ার বাসিন্দা মানিক দাস করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর থেকেই আর বাড়ির বাইরে বের হননি। স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে ফ্ল্যাটেই থাকেন। ফ্ল্যাটের নীচে হাঁক দিয়ে যাওয়া সবজি ও মাছ বিক্রেতার কাছেই বাজার সেরে নেন। কিন্তু হঠাৎই কয়েদিন আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে করোনা পরীক্ষা করে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে ভর্তি থাকার দুদিনের মাথায় তিনি মারা যান।

একই অবস্থা গুরুংবস্তির বাসিন্দা চঞ্চল সিনহার। সিকিমের একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী চঞ্চলবাবু স্ত্রীকে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তিনিও বাড়ি থেকে দুমাস ধরে কোথাও বের হননি। কিন্তু সংক্রামিত হয়েছেন তিনিও। পরে তাঁর স্ত্রীও করোনায় সংক্রামিত হন। যদিও নার্সিংহোমে কয়েকদিন কাটিয়ে মোটা বিল মিটিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দুজনই ঘরে ফিরেছেন। কিন্তু এত সাবধান থাকার পরও কীভাবে তিনি সংক্রামিত হলেন, তা মাথায় ঢুকছে না সঞ্জয়বাবুর।

- Advertisement -

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাস শুধু ড্রপলেট নয়, গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই ভাইরাস বাতাসে ভেসেও একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্ল্যাটবাড়িতে যাঁরা থাকছেন তাঁদের কিছু ছোট ছোট ভুল করোনা ভাইরাসকে ডেকে নিয়ে আসছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বহু মানুষ এমনভাবে সংক্রামিত হচ্ছেন, যাঁদের কোনও ট্রাভেল হিস্ট্রি নেই। অর্থাৎ তাঁরা গত কয়েক মাস ভ্রমণ করেননি, তাঁদের বাড়িতেও বাইরে থেকে কেউ আসেননি, এমনকি তাঁরা করোনার ভয়ে চার দেওয়ালের মধ্যেই পুরো পরিবারকে আটকে রেখেছেন। এরপরও সংক্রমণের হাত থেকে তাঁরা রেহাই পাচ্ছেন না। শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে এমন বহু মানুষ সংক্রামিত হচ্ছেন, যাঁদের শরীরে করোনা ভাইরাস কীভাবে প্রবেশ করল, তা নিয়ে চিন্তিত গোটা পরিবার।

কোচবিহার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার ডাঃ রাজীব প্রসাদ বলেন, আমরা খুব বেশি সতর্কতার মাঝেও কিছু কিছু ছোট্ট ভুল করছি, সেইজন্যই সংক্রমণ বাড়ছে। ফ্ল্যাটবাড়িতেই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। যেটা শিলিগুড়ির ক্ষেত্রে হয়েছে। ধরুন, একটা আবাসনে ১২টি ফ্ল্যাট আছে। সেখানকার কোনও না কোনও পরিবারের সদস্য তো বাইরে বেরোচ্ছেন। তিনি যদি সংক্রমণ নিয়ে আসেন, তাহলে গোটা আবাসনেই সেই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। কেননা, এখন এই ভাইরাস বাতাসে ভেসে থাকছে। হয়তো উপসর্গহীন কেউ লিফটে একাই ওঠানামা করার সময় একটা হাঁচি দিলেন এবং তাঁর মাস্কটি মুখের নীচে নামানো থাকল। তার সেই ড্রপলেট লিফটে ভেসে থাকবে। পরক্ষণেই ওই লিফটে যিনি উঠছেন তিনিও সংক্রামিত হবেন। কিন্তু আমরা সেটা বুঝতেই পারছি না।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেলের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, সবজি, মাছ কিনতে ফ্ল্যাটের নীচে নামা, এবং সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময়ও একজনের থেকে অন্যজন সংক্রামিত হতে পারেন। তাই করোনা থেকে বাঁচতে ৯৯ শতাংশ নয়, ১০০ শতাংশ সচেতন হওয়ার প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়ে এখন বিড়ম্বনায় পড়েছেন শহরের মানুষ। কেননা, বেসরকারি হাসপাতালে আর এই পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে না। শিলিগুড়ি শহরের বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থেকে দুমাস ধরে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। বহু মানুষ সরকারি জায়গায় ভিড়ের ঝক্কি এড়াতে প্রথম ডোজ বেসরকারি হাসপাতাল থেকেই নিয়েছেন। কিন্তু সরকারি নির্দেশেই এখন বেসরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে যাঁরা প্রথম ডোজ নিয়ে ফেলেছেন, তাঁরা এখন সমস্যায় পড়ছেন। কখনও মেডিকেল, কখনও শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতাল, কখনও মাতৃসদনে ঘুরছেন। কিন্তু সব জায়গাতেই ব্যাপক ভিড়। লম্বা লাইন দেখে পিছিয়ে আসছেন অনেকে।