অনলাইন পরীক্ষায় ছাত্রদের অর্জিত করোনা ডিগ্রি এবং তার পরিণাম

142

অনলাইন পরীক্ষায় ছাত্রদের অর্জিত করোনা ডিগ্রি এবং তার পরিণাম| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaঅতনু বিশ্বাস

মহামারিতে বিপর্যস্ত পৃথিবীতে ছকে বাঁধা জীবন-স্পন্দন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। নতুন পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে সভ্যতাকে। এ একপ্রকার বাধ্যবাধকতাই। যেমন শিক্ষাক্ষেত্র। আমার এক বন্ধুকন্যার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মেয়েটি গতবছর উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছিল। লকডাউনের ফলশ্রুতিতে পরীক্ষা পুরোটা হয়নি। যাইহোক এক ফর্মুলায় উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট অবশ্য বের হল। ভর্তিও হল কলেজে। কলেজ জীবনের মজাটা অবশ্য মাটি। কলেজের ক্লাস হচ্ছে টুকটাক, যেমন হয়। পুরোটাই অনলাইনে। আর কলেজস্তরে প্রাইভেট টিউশন তো এখন আমাদের কালচারে ঢুকে গিয়েছে। মাঝে যখন করোনা পরিস্থিতি একটু ভালোর দিকে ছিল, বাবার সঙ্গে একদিন কলকাতা দেখতে বেরিয়েছিল মেয়েটি। ন্যাশনাল লাইব্রেরি, কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস এবং তার নিজের কলেজ বিল্ডিংটাও।

- Advertisement -

এর মধ্যে প্রথম সিমেস্টার হল অনলাইনে। জানাল, সবই টিউশনের স্যরের নোট আর বইয়ে ছিল। তাছাড়া টিউশনের মাস্টারমশাই ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপের সামনেই বসেছিলেন। ইন্টারনেট নামক সিধু জ্যাঠা তো আছেই। সুতরাং পরীক্ষা ভালো হওয়ারই ছিল। হয়েছেও।

এদের অসুবিধা একটা আছে। সহপাঠীদের কাউকে এরা চেনে না। কারণ কলেজে ক্লাস হয়নি, সহপাঠীদের সঙ্গে দেখাও হয়নি কখনও। যারা এখন কলেজের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বর্ষে, তাদের এই সুবিধা রয়েছে অনলাইনে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে উত্তর পোস্ট ইত্যাদি।

অনলাইন পরীক্ষা আগেও কিছু ছিল। কিন্তু সার্বিকভাবে হাজির হয়েছে এই করোনা পরিস্থিতিতে। মাস্ক, স্যানিটাইজারের মতো এটাও এক নতুন কালচার। যে পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা লক্ষ লক্ষ এবং ভৌগোলিকভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরীক্ষার্থীরা ছড়িয়ে থাকলে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ভুক্ত। ইন্টারনেটের বিস্তৃতি এখনও উপযুক্ত নয় এই গ্রহের কোনায় কোনায়। তাই সিবিএসই কিংবা আইসিএসই অথবা বিভিন্ন রাজ্যের বোর্ড পরীক্ষা আপাতত পিছিয়ে যায়, অপেক্ষা চলে পরীক্ষা নেওয়ার উপযুক্ত মুহূর্তের। ভার্চুয়াল নয়, সশরীরে।

বিশ্বজুড়ে অনলাইন পরীক্ষা চলছে উঁচু ক্লাসে। অর্থাৎ কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ছাত্রসংখ্যা কম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এইসব পরীক্ষায় সততা নিয়ে সন্দেহ প্রবল। যথেচ্ছ চিটিং অর্থাত্ টোকাটুকির অভিযোগ উঠছে নানাভাবে। সন্দেহটা যে সর্বক্ষেত্রে অমূলক, সেটাও নয়। এই তো নভেম্বরে আইআইটি বম্বে একটি পরীক্ষা বাতিল পর্যন্ত করেছে চিটিংয়ের অভিযোগে।

বাস্তবে এই অনলাইন পরীক্ষা যেন টেক-হোম পরীক্ষা। ছাত্রদের প্রশ্নপত্র দিয়ে দেওয়া হল। তারা বাড়ি নিয়ে গিয়ে বইপত্র এবং ক্লাসনোট ঘেঁটে উত্তর দেবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো-সখনো এই ধরনের টেক-হোম পরীক্ষা হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে হবে ভিন্ন প্রকৃতির, যার উত্তর সহজে বই, ক্লাসনোট কিংবা ইন্টারনেট খুঁজে পাওয়া যায় না। ছাত্রকে প্রয়োগ করতে হয় তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা।

কোভিড পর্যায়ে অনলাইন পরীক্ষাগুলির প্রশ্নপত্র যদি এমন করা যেত, তবে সমস্যা কমে যেত অনেক। (পুরোটা অবশ্যই নয়, যেমন প্রাইভেট টিউটরের মতো বাইরের বিশেষজ্ঞর সাহায্য নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পথ এভাবে আটকাবে না নিশ্চয়ই।) কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা যে হচ্ছে না, সেটা পরিষ্কার। এমনিতেও এটা খুব সহজ নয়। না এভাবে পড়ানো হয় বেশিরভাগ জায়গায়, না বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নকর্তারা এভাবে প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত, না ছাত্ররা অভ্যস্ত এভাবে পরীক্ষা দিতে।

পরিবর্তে তাই নানা স্ট্র‌্যাটেজি নেওয়া হয়েছে জায়গায় জায়গায়। যেমন প্রশ্নের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে লিখতে হয় অনেক অথবা আলোচনা করা, বইপত্র বা ইন্টারনেটে খোঁজার অবকাশ না মেলে। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার অনলাইন পরীক্ষাতেও দূর থেকে পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করছে। নানাভাবে। যেমন কোনও ছাত্র যখন পরীক্ষা দেবে, মোবাইল বা ল্যাপটপের ক্যামেরা যেন তার দিকে ফোকাস করা থাকে। নানাবিধ অ্যান্টি-চিটিং সফটওয়্যারেরও সাহায্য নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র উলটোপালটা দেওয়া হয়েছে কিংবা প্রশ্নগুলো এক-এক করে স্ক্রিনে আসবে, ফিরে যাওয়া যাবে না আগের প্রশ্নে।

তবুও কোনও কিছু করেই কিন্তু টোকাটুকি আটকানো যায় না। নিয়ম যত কড়া হয়, তার দুর্বলতাও বের হয় দ্রুত। দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে যেসব ছাত্র অন্যান্য সিমেস্টারে ৬০-৭০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে, করোনাকালের অনলাইন পরীক্ষায় তাদের নম্বর ৯০-৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। শুনতে বেশ। কিন্তু কতটা ভয়ংকর হতে পারে এর ভবিষ্যৎ!

চাকরির বাজারে এই ছাত্রদের হাতে থাকবে কোভিড ডিগ্রি, যার এক বা একাধিক সিমেস্টারের পরীক্ষা হয়েছে অনলাইনে। হয় প্রহরাহীন, অথবা যার প্রহরা সন্দেহাতীত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোয় প্রাপ্ত নম্বর অন্যান্য সিমেস্টারের তুলনায় অনুপাতহীন রকমের বেশি। সেটা কিন্তু আদৌ উল্লাসের নয়, বরং ভয়ের। চাকরির বাজারে এরা কতটা দাম পাবে এদের আগের কিংবা পরের ব্যাচের স্বাভাবিক সময়ে পরীক্ষা দেওয়া ছাত্রদের তুলনায়?

অথচ এভাবে পরীক্ষা নেওয়া কোভিড পর্বের বাধ্যবাধকতা। আমি কিন্তু উদ্বিগ্ন। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে। কখনও তাই মনে হয়, এভাবে পরীক্ষা না নিয়ে যদি গোটা দুনিয়ার শিক্ষাবর্ষই পিছিয়ে যেত বছরখানেক, তা-ও হয়তো এই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ভালো হতে পারত। কে জানে!

অনলাইন পরীক্ষায় সবাই নিশ্চয়ই চিটিং করে না, কিছু ছাত্র করে। কিন্তু ছাত্ররা চিটিং করে কেন? আসলে কিছু ছাত্র টোকাটুকি করলে সৎ ছাত্ররা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে – এই মানসিকতা বোধকরি দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে। নানা ফোরাম থেকে কিন্তু পরীক্ষা সিস্টেমের বদলে প্রোজেক্ট, মৌখিক পরীক্ষা, অ্যাসেসমেন্ট ইত্যাদির সাহায্যে মূল্যায়নের প্রস্তাব উঠেছে গত এক বছরে। বিশ্বজুড়েই। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রচেষ্টা হলেও সার্বিকভাবে বহু পুরোনো এবং বহু পরীক্ষিত পরীক্ষা ব্যবস্থার কোনও বিকল্প যে এখনও তৈরি হয়নি, সেটা একেবারে পরিষ্কার।

এই প্রসঙ্গে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১২ সালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী টেক-হোম স্ক্যান্ডাল উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়টির পলিটিক্স-এর একটি পত্রের পরীক্ষা টেক-হোম প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে নেওয়া হত। যেমন ২০১০ বা ২০১১-তে এই টেক-হোম পরীক্ষায় ছাত্রদের প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়েছিল। কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু ২০১২ সালে দেওয়া হয় সংক্ষিপ্ত উত্তরের উপযোগী প্রশ্ন এবং ১২৫ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে টোকাটুকির অভিযোগ ওঠে। তদন্তের ফলে প্রায় ৭০ শতাংশ অভিযুক্ত ছাত্র দোষী সাব্যস্ত হয়। এই নিয়ে সেসময় আমেরিকায় আলোড়ন উঠেছিল।

নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরীক্ষা দেওয়ায় সকলেই যে হার্ভার্ডের ছাত্রদের ওপর খড়্গহস্ত ছিলেন, তেমনও নয়। যেমন মার্কিন সাংবাদিক ফারহাদ মঞ্জু। ২০১২-র সেপ্টেম্বরে স্লেট পত্রিকায় মঞ্জু লেখেন, কীভাবে একসঙ্গে কাজ করবেন, তা-ও এক গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। আজ জীবনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনায়, সামরিক ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানে, কর্পোরেট জগতে সত্যিকারের ব্রেকথ্রু-গুলি হয় দলবেঁধেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও দলবদ্ধভাবে কাজকে দাম দেওয়ার সময় এসেছে। বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারা নিঃসন্দেহে। এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ থাকতে পারে। তবে এটাও ঠিক যে, পুঁথিগত প্রশ্নপত্রের গতানুগতিক পরিসরে ছাত্রদের দলবদ্ধভাবে পরীক্ষা দেওয়া যে অভিপ্রেত নয়, তাতে সন্দেহ কম।

আপাতত কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অশনিসংকেতের প্রেক্ষিতে কোভিড ডিগ্রির দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভূত ছাত্রদের কতটা তাড়া করতে পারে, সেটাই প্রশ্ন।

(লেখক কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)