করোনা মহামারি প্রাথমিক শিক্ষায় অসাম্যের বীজ বুনে দিল দশ মাসে

238

বাপ্পা সরকার

কীরে কৌশিক, তুই খেলতে আসিস না কেন? এখন তো স্কুল নেই, স্কুল তো বন্ধ। কৌশিক কিন্তু সিরিয়াস। সে বলে, স্কুল বন্ধ হলে কী হবে, আমাদের সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টে পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস চলে। মা বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না। তোদের বুঝি ক্লাস হয় না? কাল ছুটি আছে। আসিস, দুজনে গেম খেলব। এই দেখ, নতুন মোবাইল বাবা কিনে দিয়েছেন।

- Advertisement -

করোনা সংক্রমণের ভয়ে গত বছর ১৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে রাজ্যের সমস্ত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করেছিল, সেই পরিস্থিতি থেকে এখনও পুরোপুরি মুক্তি মেলেনি। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন কিছুটা চালু হয়েছে মাত্র। দীর্ঘ প্রায় দশ মাস বিদ্যালয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এর সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের শিক্ষকরা নিজেদের উদ্যোগে পড়াশোনা অনেকটা অনলাইনে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে। সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়ম করে কিছু অনলাইন ক্লাস চলছে। কিন্তু সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির প্রায় ৯৮ শতাংশে অনলাইনে পড়াশোনা চলছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গ্রামে ৫৫,৩৮,৭৬০ এবং শহরে ১৩,৪৬,১৮৯। লোকাল বডি,  ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি এবং সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নিয়ন্ত্রণাধীনে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গ্রামে ১৭,৪৯২ এবং শহরে ১,৭১,৩৮৪। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে গ্রামে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৭,৭৫,০০৩ এবং শহরে ৫,৪০,৪৪১। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, রেল স্কুল এবং সৈনিক স্কুলগুলির গ্রাম এবং শহর মিলিয়ে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩৬,৩১৯ আর মাদ্রাসায় প্রাথমিকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১,০৮,৯০০। পশ্চিমবঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক মিলিয়ে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৯৫,৩৪,৪৮৮। ২৪.৮৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রী বেসরকারি বিদ্যালয়ে অনলাইনে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে শিক্ষাগ্রহণ করছে। মাত্র ০.৩৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় বা রেল স্কুলে অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করছে। কিন্তু ৭৪.৭৪ শতাংশ ছাত্রছাত্রীরই পঠনপাঠনে ব্যাঘাত ঘটছে বা বলা যায় একেবারে বন্ধ। একই সমাজে একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে এই অসাম্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভারতবর্ষে প্রায় ১৪ কোটি শিশু করোনা মহামারির প্রভাবে শিক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এভাবে।

আমাদের রাজ্যে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির শিশুরা অধিকাংশই পড়াশোনা থেকে এখন বিচ্ছিন্ন। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশ বই থেকে পুরোপুরি দূরে চলে গিয়েছে। কিছু অভিভাবক নিজেদের উদ্যোগে কিছুটা সময় পড়াশোনা করাচ্ছেন মাত্র। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কিছু অংশ পরিবারের নজরদারিতে দিনের কিছুটা সময় বই খুলে দেখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কী পড়বে? এছাড়া কতটা পড়বে, তার সঠিক কোনও গাইডলাইন না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। আমাদের দেশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনায় অভ্যস্ত পড়ুয়ারা এই অবস্থায় কার্যত দিশাহীন। পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা দপ্তর ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষা ছাড়াই পরবর্তী ক্লাসে উঠিয়ে দেওয়া হবে। ব্যাস, সবাই নিশ্চিন্ত, আর পড়াশোনা করে কী হবে? বিভিন্ন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিন্তু পড়াশোনা হচ্ছে। নামকরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি অডিও-ভিডিও ক্লাস, হোমওয়ার্ক, অনলাইন পরীক্ষা এমনকি শরীরচর্চার মতো ক্লাস অনলাইনে চালাচ্ছে। সাধারণ মানের বেসরকারি বিদ্যালয় যেখানে অনলাইন ক্লাস করার জন্য প্রযুক্তি তেমন উন্নত নয়, সেখানেও হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক সহ নানা সামাজিক মাধ্যমে হোমওয়ার্ক, পড়াশোনা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

এই অসাম্য বৃদ্ধির কারণ কী কী? সরকার পোষিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস করা এক প্রকার অসম্ভব। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এইসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবকের স্মার্টফোন নেই, প্রায় ৮৫ শতাংশ অভিভাবকের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার নীচে, ৩০ শতাংশ অভিভাবক অশিক্ষিত এবং প্রায় ৪০ শতাংশ অভিভাবক প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। ফলে স্মার্টফোনের অভাব রয়েছে। যাঁদের স্মার্টফোন রয়েছে, তাঁদের মধ্যেও সচেতন এবং শিক্ষিতের সংখ্যা খুব কম। অনেকের স্মার্টফোন থাকলেও দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা ইন্টারনেট চালানোর মতো খরচ জোগানোর সাধ্য নেই। তাছাড়া অনলাইন ক্লাস করার মতো নেটওয়ার্কেরও ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ প্রাথমিক স্কুল গ্রামে এবং বেশিরভাগ গ্রামে নেটওয়ার্কের প্রচণ্ড সমস্যা রয়েছে। সে কোচবিহারের দিনহাটার গিতালদহ হোক আর কাকদ্বীপই হোক, ইন্টারনেট স্পিড যেন পিঁপড়ের গতিতে চলে।

অন্যদিকে, যাঁদের শিশু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, তাঁদের প্রায় প্রত্যেক পরিবারের স্মার্টফোন রয়েছে। কারও কারও বাড়িতে রয়েছে কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট। সেই অভিভাবকরা অধিকাংশই শিক্ষিত। যদিও কোনও পরিবার অল্প শিক্ষিত হয়, তাদের রয়েছে গৃহশিক্ষক। করোনা মহামারিতে প্রথমদিকে দুএক মাস  হোম টিউশন বন্ধ ছিল ঠিকই, কিন্তু পুনরায় অধিকাংশ হোম টিউশন চালু হয়ে গিয়েছে। যাঁরা চাকরি সূত্রে বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন, তাঁদের অনেকে গৃহশিক্ষক কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা এখন নিজেরাই শিশুদের সময় দিচ্ছেন। অন্যদিকে, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক রাখতেন, তাঁরা বেশিরভাগই গৃহশিক্ষক রাখা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার যেহেতু শিশুদের পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ করে দিয়েছে, তাই বাড়িতে আলাদা করে আর পড়ানোর দরকার নেই। এতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্য ক্রমশ বাড়তে থাকায় ধীরে  ধীরে  দুটো শ্রেণি তৈরি হচ্ছে সমাজে। শিশুদের পড়াশোনার অভ্যাস বদলে যাচ্ছে, নেতিবাচক মন গড়ে উঠছে।

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, নিজেদের ভালো প্রমাণ করার জন্য। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থা শিকেয় উঠেছে আর বেসরকারি বিদ্যালয়গুলি নিজেদের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে অনলাইন শিক্ষায় কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না। লোকসমাজে প্রচার হয়ে যাচ্ছে, বেসরকারি বিদ্যালয়ে টাকা গেলেও পড়াশোনা হচ্ছে। প্রশংসা বেশি করে প্রচার পাচ্ছে এই স্কুলগুলি। মানুষ এতে আগ্রহী হচ্ছে। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এই মহামারিতে ধীরে ধীরে কফিনে বন্দি হয়ে গিয়েছে, যা অশনিসংকেত গোটা সমাজের কাছে। যার প্রভাব অদূর ভবিষ্যতে সমস্ত সরকারি সব ধরনের শিক্ষাঙ্গনে পড়বে। সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের সন্তানদের ভবিষ্যতে কালো মেঘ জমছে। মহামারির কথা মাথায় রেখেও তাই সাবধানতা অবলম্বন করে  স্কুল খোলা আশু প্রয়োজন। দ্রুত বিদ্যালয় খোলা সম্ভব না হলে পঠনপাঠন চালু করতে বিকল্প কোনও পদ্ধতি খোঁজা যায় কি না, সেদিকে  সরকারি দৃষ্টিপাত খুব দরকার। শিক্ষা দপ্তর প্রথমদিকে অ্যাক্টিভিটি টাস্কের মাধ্যমে একটা চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু তা সর্বাংশে সফল হয়নি। শিক্ষকদেরও কর্তব্য, শিক্ষাদানের বিকল্প পথ খুব দ্রুত বের করা। বর্তমানে পরিবহণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক। ফলে অ্যাক্টিভিটি টাস্ক বা হোমওয়ার্ক বেস সাপ্তাহিক কিংবা তিন-চার দিন অন্তর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ অথবা প্রশ্ন-উত্তর ছাপানো বুকলেট বানিয়ে অভিভাবকের মাধ্যমে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা যেতে পারে। কিংবা শিক্ষকরা যদি নিজেদের ভাবনায় নতুন কোনও পদ্ধতি বের করতে পারেন, তাহলে অসাম্যের ক্ষত কিছুটা নিরাময় করা সম্ভব হত।

(লেখক দিনহাটা কলেজের ভূগোলের অধ্যাপক)