সাবধান! পুজোমণ্ডপের ভিড়ে লুকিয়ে করোনা

বাঙালি বহু প্রতীক্ষিত উৎসবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে হাতে মাত্র কয়েকটা দিনপ্রায় সকলেই সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকেনশুধু পুজো উপভোগ করা নয়, দূরে থাকা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এটাই সেরা সুযোগকিন্তু এবছর আমাদের আনন্দে বাধ সেধেছে কোভিড১৯এই ভাইরাস এবার আমাদের সঙ্গে থাকবে বলে ঠিক করেছেসে যেহেতু সংক্রমণ থেকে রেহাই দিতে নারাজ, তাই আমাদেরই সংযত হতে হবেআর তার জন্য ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আড্ডা দিয়ে এবং সামান্য অসুস্থ বোধ করলে বাড়িতে থেকেই পুজোটা কাটাতে হবেলিখেছেন কার্ডিয়াক সার্জন ডাঃ কুণাল সরকার

গত কয়েক মাস আমরা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। করোনা আমাদের প্রত্যেকের জীবন সে মানসিক হোক বা আর্থিক- সব দিক দিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। অনেকেই বেশ খানিকটা বিপর্যস্ত হলেও মা আসার আনন্দে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এবছর আবেগের বশে গা ভাসালে চলবে না। তাহলেই বিপদ। হ্যাঁ, এখনও আমাদের রাজ্যে লাগামছাড়া পরিস্থিতি না হলেও, যেহেতু এটা একটা বিরাট উৎসব, তাই সতর্কতা বাঞ্চনীয়। কারণ, ইতিপূর্বে দেখা গিয়েছে, চিন হোক বা ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকার নর্থ ডাকোটা বা ভারতের কেরল- সব জায়গাতেই করোনা তার ভয়াবহতাকে প্রকাশের জন্য উৎসবের সময়কে বেছে নিয়েছে। এই সব দেশের মানুষ যখনই করোনার ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করে উৎসবের আয়োজন করেছেন, তখনই করোনা লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে ছেড়েছে। কেরলে তো ওনাম উৎসবের পর সংক্রমণ চার গুণ বেড়ে গিয়েছে। অতএব, আমাদের ভাবতে হবে। কারণ, বাঙালির দুর্গাপুজোর সঙ্গে ভিড় ব্যাপারটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুধু ঠাকুর দেখার ভিড় নয়, আরতির সময়, অঞ্জলির সময় এবং ভাসানের সময়ও ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। আমরা এখনও সংক্রমণকে কবলে আনতে পারিনি, তাই এবছর ঠাসাঠাসি করে পুজো দেখার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

- Advertisement -

এবার মাস্ক পরার কথায় আসি। দেখুন, করোনা ভাইরাসের আকার টেনেটুনে ১ মাইক্রন। ১ মাইক্রন মানে ১ মিলিলিটারের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগ। হয়তো এর আকার ১ মাইক্রনও নয়। মাস্ক যে সব ড্রপলেট থেকে আমাদের রক্ষা করে, সেগুলো ১৫০-২০০ মাইক্রন। অনেকেই বলবেন, কোথায় ১, আর কোথায় ১৫০! তাহলে মাস্ক পরে হচ্ছেটা কী? ঘটনা হল, ভাইরাসটা একা একা ঘুরে বেড়ায় না। এর সঙ্গে কিছু জলীয় বাষ্প থাকে, কিছু ধুলো থাকে। অবশেষে যে বড় ড্রপলেটগুলো তৈরি হয়, তার আকার ২০০-র কাছাকাছি। সেই কারণে আমরা মাস্ক পরে থাকলে সুরক্ষিত থাকব। অন্যদিকে ধরা যাক, বড় কোনও পুজোমণ্ডপে গত বছর ৫ হাজার লোককে ঢোকানো হয়েছিল। এবছর পুজোমণ্ডপের একদিক খোলা আর তিনটে দিক ঢাকা। ঠিক হল, এবছর করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ৪ হাজার ৯৯৯ জনকে ঢুকতে দেওয়া হবে- এই ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভুল হবে। মণ্ডপে একটা বা দুটো দিক খোলা রাখলেও একটা ঢাকাঢাকির ব্যবস্থা হবেই। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বাভাবিক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, কথাবার্তার মধ্যে যে বাষ্প পদার্থগুলো তৈরি হবে, সেগুলোকে আমরা এরোসল বলি। এই এরোসলের কণাগুলো এত ছোট যে, যত বেশি এরোসল হবে, তত মাস্কগুলোর সক্রিয়তা কমতে থাকবে। সুতরাং, অবরুদ্ধ জায়গা, যেখানে হাওয়া চলাচলের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেই, সেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষ জড়ো হলে সমূহ বিপদ। এবছর পুজো প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে একটু ফাঁকাই থাকুক। তাই বলে রোলের দোকান বা চায়ের দোকানে গিয়ে ভিড় বাড়াবেন না।

শুধু ভিড় কম হলেই হবে না, আওয়াজও যাতে কম হয়, সে ব্যাপারে পুজো কমিটিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, প্যান্ডেলের ব্যাকগ্রাউন্ডে গান চললে বা হইহট্টগোল হলে, তাহলে যে কজন মানুষ একটা জায়গার মধ্যে থাকবেন তাঁরা চেঁচিয়ে চিৎকার করে, কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলবেন, যা আরও বিপজ্জনক। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা অবস্থায় মুখ দিয়ে মেরেকেটে ৫-১০টা ড্রপলেট বেরোবে। কিন্তু চিৎকার করে কথা বললে ১০০, ২০০ বা ৩০০টা ড্রপলেট বেরোতে পারে। অর্থাৎ যে কেউ এভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন। পুজো কমিটির সদস্য থেকে কর্মকর্তা, পুরোহিত, ভলান্টিয়াররা-যাঁরা সবসময় প্যান্ডেলের ভিতরে যাতায়াত করবেন, সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসবেন, তাঁরা অবশ্যই পুজোর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে টেস্ট করাবেন।

অন্যদিকে, যাঁরা ভাবছেন এবছর প্যান্ডেল হপিং নয় বাদই থাক, আড্ডা মেরেই পুজোটা কাটিয়ে দিই, তাঁদের জন্য বলব, আড্ডা যদি ঠাসাঠাসি ভিড়ের পরিবেশ ছাড়া হতে পারে, তাহলে অসুবিধা নেই। বয়স্কদের জন্য বলব, যাঁদের দুচার রকমের রোগ রয়েছে, বেশ কিছু ওষুধ খান বা কোনও চিকিৎসা চলছে তাঁরা কিন্তু কোনওভাবেই ভিড়ভাট্টায় যাবেন না। সে যদি প্যান্ডেলে লোক কম থাকে, তাও নয়। আর যারা অল্পবয়সি তারা নিশ্চয়ই একটু বেরোও, মনটাকে হালকা করো, একটু আনন্দ করো। এছাড়া নতুন জামাকাপড় পরা বা বাইরের খাবার নিয়ে তেমন কোনও বিধিনিষেধ নেই।

সব কিছুতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বারবার হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করা, মাস্ক পরা, সতর্ক থাকা খুব জরুরি। তবে গ্লাভস না পরাই ভালো। কারণ, গ্লাভস না পরে যে সব জায়গা স্পর্শ করছ না, গ্লাভস পরলে সেই সব জায়গা স্পর্শ করার প্রবণতা বাড়বে। ফলে অসচেতনভাবে গ্লাভসে বিভিন্ন ধুলো, জীবাণু ইত্যাদি জমা হবে। স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ছাড়া আর কারওই গ্লাভস পরা উচিত নয়। কারও যদি মনে হয়, আজকে শরীরটা ভালো লাগছে না, একটু গা ম্যাজম্যাজ করছে, একটু গলা খুসখুস করছে তাহলে কোনও রকম ঝুঁকি নিয়ে বাইরে আর বেরিও না। তাই বলে যে করোনা হয়েছে তা মোটেও নয়। কিন্তু তোমাদের থেকে অন্য লোকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

সম্প্রতি বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সংক্রমণ যখন ছড়ায় তখন হয়তো প্রত্যেকের থেকে ওভাবে ছড়ায় না, আমরা বলি সুপার স্প্রেডার। কেন সুপার স্প্রেডার? ধরুন, কারও জ্বর হয়েছে। প্রথম ২-৩ দিনের মধ্যে তিনি ভাইরাসটা সবচেয়ে বেশি ছড়াতে পারেন। এবার তিনি এমন জায়াগায় গেলেন, যেটা সীমাবদ্ধ। সেখানে আরও কিছু লোক রয়েছেন। সব কিছু মিলিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যে, সেই গোবেচারা মানুষ, যার হয়তো কেবল গলা খুসখুস করছিল, তিনি অল্পসময়ে মধ্যে অনায়াসে ২৫-৩০ জন লোককে সংক্রামিত করে চলে গেলেন। সেই ৩০ জন জানতেও পারলেন না। তাঁরা প্রথম কয়েকদিনের মধ্যে এখানে-সেখানে গিয়ে অন্য লোকেদের সংক্রামিত করলেন। অতএব,আমরা যেন কখনও সুপার স্প্রেডিং অবস্থাকে প্রশ্রয় না দিই। সর্বোপরি শ্বাসযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণের আঁচ মাস দুয়ে ধরে একদম ঠান্ডা না হলেও প্রচণ্ড গরম অবস্থায় ছিল না। মোটামুটি একটা জায়গায় আমরা নিজেদের ধরে রাখছিলাম। টেস্ট পজিটিভিটি রেট একসময় ৮-৯ শতাংশ হয়েছিল। তারপর সেটা কমে ছয়ের ঘরে পৌঁছাল। আর নম্বর (R number) সেটাও কম ছিল। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে অক্টোবরের গোড়া থেকে আঁচটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। টেস্ট পজিটিভিটি রেট বেড়ে গিয়েছে, ৮ শতাংশের কাছাকাছি। হাসপাতালের ওপর ভযংকর চাপ আসছে। লাগামছাড়া পরিস্থিতি না হলেও ঈগলের চোখের মতো আমাদের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে। আসন্ন দুর্গাপুজোয় আমরা যদি একটু অসতর্ক হয়ে ঠেলাঠেলি করে, ভিড় করে, প্রচণ্ড চিৎকার করে জনসমাগমের পরিস্থিতি তৈরি করি, তাহলে সংক্রমণের ঢেউ আর ঢেউ থাকবে না, সুনামি হয়ে আছড়ে পড়বে, যেটা কেউ চাইছি না।