বঙ্গে করোনা কোপ: দু’দিনে মৃত ১৫, আক্রান্ত বাড়ল ১২৭

933
File Picture

কলকাতা: রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কত? টানা দু’দিন বিভ্রান্তির পর সরকারের উত্তর মিলল শনিবার রাতে। একসঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তর দু’দিনের বুলেটিন প্রকাশ করল। মে দিবসের ছুটি থাকায় শুক্রবারও রাজ্য সরকারের তরফে সাংবাদিক বৈঠক হবে না বলে আগেই জানিয়েছিলেন মুখ্যসচিব রাজীব সিনহা।

কিন্তু শনিবারও নবান্নে কোনও সাংবাদিক বৈঠক হয়নি। অথচ এই বৈঠকেই সোমবার থেকে লকডাউনে শিথিলতা সম্পর্কে রাজ্য সরকারের নির্দেশনামা জানানোর কথা ছিল। মুখ্যসচিব নিজেই সেই কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কী কারণে সাংবাদিক বৈঠক বাতিল করা হল, নবান্নের পক্ষ থেকে তার কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

- Advertisement -

ইতিমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে উঠেছে রাজ্য সরকারের পৃথক দুটি পরিসংখ্যানে। গত বৃহস্পতিবার মুখ্যসচিব সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছিলেন, সেদিন পর্যন্ত রাজ্যে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৭২। স্বাস্থ্য দপ্তরের সেদিনের বুলেটিনেও সংখ্যাটি একই ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব প্রীতি সুদানকে পাঠানো রাজ্য স্বাস্থ্যসচিবের চিঠি ঘিরেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ওই চিঠিতে শুক্রবার স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার জানিয়েছেন, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যের ১৫টি জেলায় মোট ৯৩১ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক রোজ যে বুলেটিন প্রকাশ করে তাতেও এই সংখ্যাটি নেই। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৫। একটি পরিসংখ্যানের সঙ্গে অন্যটির হিসেব মিলছে না। স্বভাবতই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষও সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাহলে কি ঝুলি থেকে বেড়ালটা বেরিয়ে পড়ল। সরকার কি তাহলে সত্যি এতদিন সত্য গোপন করেছে? ইত্যাদি প্রশ্ন এখন সকলের।

শনিবার রাতে প্রকাশিত দুদিনের বুলেটিন অনুযায়ী, রাজ্যে গত ৪৮ ঘণ্টায় আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে, রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৮। এর মধ্যে ৩০ এপ্রিলের পর শুক্রবারের মধ্যে ৮ জন এবং তারপরের ২৪ ঘণ্টায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে, এই দুদিনে আরও ১২৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে ওই দুটি বুলেটিনে জানা গিয়েছে। শুক্রবারের বুলেটিন অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৭। শনিবার জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭০ জন করোনা আক্রান্তের হদিস মিলেছে। রাজ্য সরকার অবশ্য এই দুটি বুলেটিনে জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় মোট ৬০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এদের মধ্যে শুধু শনিবারই হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয়েছে ৪৫ জনকে। এঁরা সবাই এমআর বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বলে জানানো হয়েছে৷ এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৫৪। এই হিসেবও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের শুক্রবারের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের শুক্রবারের বুলেটিন অনুযায়ী, রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৫। স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব প্রীতি সুদানকে যে হিসেব দিয়েছিলেন, সেটা আরও অনেক বেশি।

শনিবার সকালে এই সংক্রান্ত বিতর্ক উসকে দিয়েছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকরও। তিনি টুইটে স্বাস্থ্যসচিবের চিঠি এবং মুখ্যসচিবের দেওয়া তথ্য দুটি আলাদাভাবে পোস্ট করেছেন। বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য রাজ্য সরকারকে বার্তা দিয়েছেন। টুইটে বলেছেন, সরকারের কাছে সকলের প্রত্যাশা রয়েছে। রাজ্য সরকার কিছু না জানালেও সংক্রমণ কিন্তু বেড়েই চলেছে। শনিবার আবার খবরের শিরোনামে এসেছে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ। এই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটিতে ৮ জন রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। রাজ্যের কোনও হাসপাতালে একসঙ্গে এতজন রোগী করোনা পজিটিভ হওযার নজির এই প্রথম। আক্রান্তদের মধ্যে ৬ জনই প্রসূতি। আর একজন ছিলেন মেল মেডিসিন ওয়ার্ডে। অন্য একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর জানা গিয়েছে তিনি করোনা পজিটিভ।

নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই ৮ জন রোগীর সংস্পর্শে কারা কারা এসেছিলেন, তাঁদের এখন খোঁজ চলছে। জানা গিয়েছে সাংবাদিক বৈঠক না হলেও এদিন বিকেলে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে চিকিত্সকদের জন্য একটি অ্যাডভাইসরি জারি করা হয়েছে৷ ওই অ্যাডভাইসরিতে বলা হয়েছে, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, ডায়ালিসিস, কেমোথেরাপি, প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান প্রসব টিকাকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নানা অজুহাতে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভর্তির আগে করোনা পরীক্ষা করে আসতে বলা হচ্ছে। এই ধরনের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে ওই অ্যাডভাইসরিতে। এদিনই সকালে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে টুইটে রাজ্যপাল লিখেছেন, করোনার তথ্য লুকোনো বন্ধ করুন। সবার সামনে সেটা প্রকাশ করুন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে, সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী পর্যন্ত সবাই এক সুরে বলছেন, সরকার প্রতিদিন যেভাবে তথ্য বদল করছে, তাতে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে, কোনওকিছু গোপন রাখার চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিবকে চিঠিটি লিখেছিলেন রাজ্যে রেড জোন সংক্রান্ত জটিলতা সম্পর্কে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক শুক্রবার এক নির্দেশিকায় রাজ্যে রেড জোনের সংখ্যা ৪টি থেকে জেলা থেকে বাড়িয়ে ১০টি করেছিল। এতে আপত্তি জানায় রাজ্য সরকার। স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার ওই চিঠিতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিবকে মনে করিয়ে দেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রকের গাইডলাইন অনুযায়ী রাজ্যে ৪টি জেলাকে রেড জোনের আওতায় আনা হয়েছিল। সেই গাইডলাইন পরিবর্তনের কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জোনভিত্তিক তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করার অনুরোধ ছিল স্বাস্থ্যসচিবের ওই চিঠিতে। যদিও শুক্রবারই কেন্দ্রীয স্বাস্থ্যসচিব লব আগরওযাল বলেছিলেন, আমরা বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখেছি। আজ হয়তো অনেক জায়গায় সংক্রমণ কম আছে, কিন্তু আগামীদিনে যেন এমন না হয় যে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমন যেন না হয় যে, তলায় তলায় সংক্রমণ ছড়াতে ছড়াতে সাংঘাতিক অবস্থা হয়ে যায়। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে পদক্ষেপ করা হচ্ছে।

নবান্নে সূত্রে জানা গিয়েছে, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে সারাদিন ডামাডোল চলছে প্রশাসনে। বৃহস্পতিবার মেডিকেল বুলেটিনে জানানো হয়েছিল, সেদিন পর্যন্ত রাজ্যে করোনা পজিটিভের সংখ্যা ছিল ৫৭২ জন। সেদিন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩৯ জন। রাজ্য সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩৩। প্রশাসনের একাংশের মতে, ওই সংখ্যাগুলি যোগ করলেও তা ৭৪৪-এর বেশি হয় না। মুখ্যসচিব জানিয়েছিলেন, অডিট কমিটি যে ১০৫ জনের মৃত্যুর কারণ যাচাই করেছে, তার মধ্যে করোনার কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। অন্য ৭২ জনের মৃত্যুর কারণ ভিন্ন রোগ। প্রশাসনের ওই অংশের মতে, ওই হিসেবটি ধরলেও রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮১৬। কিন্তু স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমারের চিঠিতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও শতাধিক।

বিজেপির জাতীয় আইটি সেলের ভারপ্রাপ্ত নেতা অমিত মালব্য ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের ওই দুটি পরস্পর বিরোধী পরিসংখ্যান টুইটে আপলোড করেছেন। রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্বাস্থ্যসচিবের চিঠির আগেই স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানিয়েছিল, বিভিন্ন মাপকাঠির ভিত্তিতে জোন ভাগ করা হয়েছে৷ এর ফলে রেড জোনের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। ২০ এপ্রিলের পর থেকে নতুন সংক্রমণের খবর না থাকলেও কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলাকে আবার রেড জোনে আনা হয়েছে। এই জেলাগুলি অবশ্য এর আগে অরেঞ্জ জোনে ছিল। অন্যদিকে, নতুন করে রেড জোনে এসেছে মালদা ও পশ্চিম মেদিনীপুর। আলিপুরদুয়ারে চারজন করোনা পজিটিভের হদিস মিললেও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের তালিকায় জেলাটি এখনও গ্রিন জোনে রয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানিয়েছে, সাতদিন পর পর এই জোনের তালিকায় বদল হতে পারে।

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, এটা কি ছেলেখেলা হচ্ছে? আমাদের রাজ্যে মৃত কত? সকালের তথ্য, বিকেলের তথ্য মিলছে না। তাহলে হচ্ছেটা কী? রাজভবনে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিল বিজেপির প্রতিনিধি দল। পরে ওই প্রতিনিধি দলের নেতা তথা বিজেপির রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে বলুন, লাশগুলি কোথায় গোপন করে রেখেছেন? আক্রান্তের সংখ্যা মিলছে না কেন? মানুষ এই প্রশ্নগুলির জবাব চাইছে।

করোনার সরকারি তথ্য
১. গত দুদিনে মৃত আরও ১৫।
২. মোট মৃতের সংখ্যা ৪৮।
৩. দুদিনে আরও আক্রান্ত ১২৭।
৪. রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৬৫৪।
৫. দুদিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬০ জন।
৬. রাজ্যে মোট নমুনা পরীক্ষা ২০,৯৭৬।
৭. শুক্রবার পরীক্ষা ২,০৪১, শনিবার ২,৪১০।