বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে করোনা সংক্রমণ, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সহমত হু

734
ফাইল ছবি।

জেনেভা: সারা বিশ্বে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা প্রতি মুহূর্তে লাফিয়ে বাড়ছে। এর শেষ কোথায়, জানা নেই কারও। এখনও পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৫ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৯১ জনের। আমেরিকা, ব্রাজিল, ভারতের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কবে ভ্যাকসিন বাজারে আসবে, সেটা কারও জানা নেই। এই পরিস্থিতিতে আরেক আশঙ্কার কথা শুনিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকার করে নিয়েছে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে। হু-র বক্তব্য, যেখানে মানুষের ভিড় বেশি, বদ্ধ ঘর অথবা বাতাস চলাচলের ভালো ব্যবস্থা নেই, সেরকম জায়গায় বাতাসের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত প্রমাণ মিললে আবদ্ধ জায়গায় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনা হতে পারে।

- Advertisement -

কয়েকদিন আগে বিশ্বের ৩২টি দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী দাবি করেছিলেন, হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে পারে করোনা ভাইরাস। অতিক্রম করতে পারে একটি ঘরের সমান দৈর্ঘ্য, অর্থাৎ প্রায় ১২-১৪ ফুট। এই দাবি করে বিজ্ঞানীরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে স্বাস্থ্যবিধিতে বদল আনার পরামর্শ দেন। বিজ্ঞানীদের দাবিকে শেষ পর্যন্ত মান্যতা দিল হু। জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্যবিধিতে বদল আনার কথা ভাবা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে। সেখানে নতুন স্বাস্থ্যবিধির কথা জানানো হবে। গোটা বিশ্বকে সতর্ক করে হু জানিয়েছে, এই ভাইরাসের সংক্রমণে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এর আগে, করোনা সংক্রমণ সম্পর্কে হু-র বক্তব্য ছিল, মানুষের কাশি বা হাঁচি থেকে ড্রপলেটের (ক্ষুদ্র জলকণা) মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বিজ্ঞানীরা।

হু-র উদ্দেশে লেখা চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্যতম বিজ্ঞানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ জোসে জিমেনেজ বলেছেন, ‘আমরা চাই, করোনা ভাইরাসের বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর সত্যতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকার করে নিক।‘ তাঁর মতে, ‘খোলা চিঠি দেওয়ার অর্থ হু-কে আক্রমণ করা নয়। এটা একটা বৈজ্ঞানিক বিতর্ক। তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বহুবার আলোচনার পরেও হু এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেছে। সেই কারণে বিষয়টি সকলের সামনে আনা উচিত বলে এই খোলা চিঠি।’ হংকং বিশ্ববিদ্যালযে অধ্যাপক বেঞ্জামিন কাউলিং বলেছেন, ’বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে বোঝা যাচ্ছে, টিকা না বেরোনো পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই।’

প্রাথমিকভাবে হু-এর বক্তব্য ছিল, করোনা সংক্রামিত কেউ হাঁচলে বা কাশলে তাঁর নাক ও মুখ থেকে যে জলকণা নির্গত হয়, তা কাছাকাছি থাকা অন্য কারও শরীরে প্রবেশ করলে তিনিও সংক্রামিত হতে পারেন। তাই সবাইকে অন্তত ২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়। সেইসঙ্গে মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেয় হু। হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে বারবার হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, নাকে-মুখে হাত না দেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই নিয়মে এবার বদলের পরামর্শ দিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে নয়া স্বাস্থ্যবিধি কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

তাবড় বিজ্ঞানীদের চিঠি পাওয়ার পর টনক নড়ে হু-র। মঙ্গলবার সংস্থার ডিরেক্টর টেড্রোস আধানম গেব্রেইসাস বলেন, ‘এখনই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বে প্রথম চার লক্ষ সংক্রামিত হতে যেখানে ৩ মাস সময় লেগেছিল, সেখানে বর্তমানে এক সপ্তাহে চার লক্ষ মানুষ সংক্রামিত হচ্ছেন। যতদিন যাবে, সংক্রমণের হার তত বাড়বে।’ আধানম বলেন, ’এখনও সংক্রমণ শিখর ছোঁয়নি। তবে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর হার কিছুটা কমেছে। বেশ কিছু দেশ মৃত্যু সংখ্যা কমাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখনও অনেক দেশে বেড়েই চলেছে।’

এদিকে, ম্যাসাচুসেট্স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-র এক রিপোর্ট আরও ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো। ৮৪টি দেশে বিশ্বের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের উপর সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রস্তুত ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়বে। বাড়তে বাড়তে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে প্রতিদিন প্রায় ২ লক্ষ ৮৭ হাজার মানুষ করোনা সংক্রামিত হতে পারেন। সেই সময় আমেরিকায় প্রতিদিন ৯৫ হাজার, দক্ষিণ আফ্রিকায় ২১ হাজার, ইরানে ১৭ হাজার এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৩ হাজার সংক্রামিত হতে পারেন। এই বিষয়ে হু-এর মত জানা না গেলেও, সংস্থার আধিকারিক মাইকেল রায়ান জানিয়েছেন, আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে ৫ লক্ষের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়েছে। করোনায় সংক্রামিতের সংখ্যাটাও ১ কোটি ১৮ লক্ষের কাছাকাছি। আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়েছে। সেখানে সংক্রামিতের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। এরপর রয়েছে ব্রাজিল, সংক্রামিত ১৬ লক্ষের বেশি। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত ও রাশিয়া। ভারতে ৭ এবং রাশিয়ায় ৬ লক্ষের বেশি মানুষ করোনা সংক্রামিত হয়েছেন।