করোনা টিকা যেন গাড়ির সিটবেল্টের মতো

156
ছবি: সংগৃহীত

নিউ নর্মালে অভ্যস্ত হয়ে পথ চলতে গিয়ে ফের হোঁচট খাওয়া। কারণ অবশ্যই কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। নতুন করে সংক্রমণে বেসামাল গোটা দেশ। কিন্তু যেখানে টিকা এসে গিয়েছে, সেখানে সংক্রমণ বাড়ছে কেন? শোনা যাচ্ছে অনেকের টিকা নেওয়ার পরও করোনা হচ্ছে। তাহলে কি টিকা সুরক্ষিত নয়? টিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন কার্ডিয়াক সার্জন কুণাল সরকার

প্রথমেই বলি, আমাদের দেশে প্রধানত কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে দুএকজনের বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। যাকে বলে সেরিব্রাল ভেনস থ্রম্বোসিস। অর্থাldd ব্রেনের মধ্যে যে আর্টারি, ভেনগুলো রক্ত চলাচলের জন্য আছে, সেখানে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন, কারও সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মধ্যে ফাঁকফোকর আছে, যার ফলে এমন অদ্ভুত রকমের আনফিজিওলজিকাল রিঅ্যাকশন হচ্ছে। এটা যাঁদের বয়স ৫০ বছরের নীচে, তাঁদের মধ্যে বেশি দেখা গিয়েছে। এটা অবশ্যই চিন্তার। তার মানে এই নয় যে, টিকাকরণ বন্ধ করে দিতে হবে। আবার রিঅ্যাকশন পার্সেন্টেজ খুব কম বলে একে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। বরং এই সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

- Advertisement -

বরং আমি বলব, যাঁরা এখনও ভ্যাকসিন নেননি, যাঁদের বয়স ৪৫+, তাঁরা একটু তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন নিন। কারণ আমরা কিছুটা অনিবার্য, কিছুটা নিজেদের ঢিলেমি বা গাফিলতির জন্য যে সময়টায় এসে দাঁড়িয়েছি তা ভালো সময় নয়। সংক্রমণ বাড়ছে। আগের মতো মাস্ক পরা, দূরত্ববিধি মানার অভ্যাস জারি রাখতে হবে। তবে গতবারের সঙ্গে এবারের একটাই তফাত, আমাদের নাগালের মধ্যে ভ্যাকসিন আছে। সরকারি হোক বা বেসরকারি হাসপাতাল, সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করছে, যত তাড়াতাড়ি যত বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া যায়। অতএব আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, দয়া করে তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন নিন।

মনে রাখবেন, ভ্যাকসিন হল সিটবেল্টের মতো। সিটবেল্ট লাগিয়ে বোকার মতো গাড়ি চালালে অ্যাক্সিডেন্ট তো হবেই। কিন্তু সিটবেল্ট লাগানো ছিল বলে আঘাত ততটা গুরুতর হবে না। অর্থাৎ সিটবেল্ট অ্যাক্সিডেন্ট প্রতিরোধ করতে পারে না। কিন্তু মারাত্মক ক্ষত প্রতিরোধ করতে পারে। একইভাবে ভ্যাকসিনও তাই। ভ্যাকসিন নিলে হয়তো ১০০ জনের মধ্যে ৭০ জনের সংক্রমণ হবে না। বাকি ৩০ জনের হবে। কিন্তু সেই ৩০ জনের মধ্যে ৯৫ শতাংশের সংক্রমণ হলেও সেটা মারাত্মক পর্যায়ে যেতে দেবে না। একইভাবে কোভ্যাকসিনও সমান কার্যকর।

এবার আসি উপসর্গের কথায়। আগেরবারের সঙ্গে এবারের উপসর্গের তেমন তফাত নেই। বরং জ্বর, গলাব্যথা ইত্যাদি হলে টেস্ট করিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের। এক্ষেত্রে কোভিড ওয়াচ অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের মনিটর করতে পারবেন। এই অ্যাপে কতগুলো প্রশ্ন পাবেন, যেমন জ্বর কীরকম আছে, গলাব্যথা হচ্ছে কিনা, পালস রেট বাড়ছে কিনা, পেটের কী অবস্থা ইত্যাদি। এসব পর্যবেক্ষণ করুন। এরমধ্যে যদি তেমন সমস্যা থাকে, তাহলে এই অ্যাপ আপনাকে অ্যালার্ম দেবে। যদি অ্যালার্ম পান, তাহলে অবশ্যই দেরি না করে নিকটবর্তী হাসপাতালে যান। অক্সিজেনের স্যাচুরেশন চেক করে ডাক্তার বলে দেবেন, আপনি হাসপাতাল না বাড়ি, কোথায় থাকবেন। এটা ফ্রি অ্যাপ। আপনি চাইলে এর মাধ্যমে ডাক্তারদের সঙ্গেও কথা বলতে পারবেন। টেলিমেডিসিনেও কথা বলতে পারেন।

অন্যদিকে, যাঁদের ডায়াবিটিস, হাইপ্রেশার, ক্যানসার রয়েছে, তাঁরা চিকিৎসা বন্ধ করে দেবেন না। বরং ডাক্তারের পরামর্শমতো ফলোআপে থাকুন। এই পরিস্থিতিতে যদি মনে হয় ডাক্তারের কাছে পৌঁছোতে পারছেন না, তাহলে হেল্পলাইন ব্যবহার করুন বা ফোন করুন।

এখন হাজার জনের মধ্যে ৬-১০ জনের কোভিড হচ্ছে। হাজার জনের মধ্যে যদি ৬ জন হয়, তাহলে ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবে ১০০ জন। ১০ লক্ষ মানুষের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবে ১ হাজার জন। অতএব, এত অঙ্ক না কষে চোখ-কান খোলা রাখুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। এখনও এমন কিছু ঘটেনি যে, তার জন্য টিকাকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হবে।