ফেলো কড়ি, নাও চাকরি : দেশজুড়ে নিয়োগে দুর্নীতি

2187

শুভঙ্কর চক্রবর্তী  : চাকরি তো নেই-ই। তার ওপর, যদিও বা কোথাও নিয়োগ হয়ে থাকে, তাতে কেলেঙ্কারির শেষ নেই। দুর্নীতি শুধু বাংলায় নয়, সর্বভারতীয় নিয়োগেও। সাধারণ চাকরি তো বটেই, কেলেঙ্কারির স্পর্শ এড়াতে পারছে না সেনাবাহিনী কিংবা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো সংস্থাগুলিও। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপম কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল। তখনই তদন্তকারীদের বক্তব্য ছিল, মধ্যপ্রদেশের ওই কেলেঙ্কারিটি আসলে সারাদেশের ক্ষেত্রে হিমশৈলের চূড়া মাত্র। দেশজুড়ে কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির শেষ নেই সরকারি কর্মসংস্থানে। রেলের ক্ষেত্রেও প্রায়ই এমন অভিযোগ ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে কোথাও যদি সামান্য নিয়োগ হয়ে থাকে, সেখানে দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। স্বজনপোষণ, দলীয় পক্ষপাত থেকে আর্থিক দুর্নীতির নানা অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে আইনি জট। এই জটিলতার জেরে আখেরে ঝুলে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। ফলে কর্মসংস্থান অধরাই থাকছে শিক্ষিত বেকারদের। দিন দিন শুধু ডিগ্রিপ্রাপ্ত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কর্মসংস্থানের বেহাল ছবিটা আরও করুণ হয়ে উঠেছে সীমাহীন এই দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে। দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা কোথায় নেই? প্রশ্ন করলে দীর্ঘ তালিকা সামনে আসবে। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের নানা চাকরি, পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি থেকে ডব্লিউবিসিএস অফিসার পদে নিয়োগ, পঞ্চায়েতকর্মী থেকে আশাকর্মীর পদ পূরণে রাজ্যের প্রায় সমস্ত জেলা থেকে দুর্নীতির দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ্যে আসছে। এর ওপর আছে নবীন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের চাকরির সুযোগ বন্ধ করে অবসরপ্রাপ্তদের বিভিন্ন পদে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ। চাকরি মানেই যেন ফেলো কড়ি, মাখো তেল। মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে কোনও চাকরিই হওয়ার জো নেই। সে যত কম মাইনের চাকরিই হোক না কেন, টাকা না দিয়ে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাটমানি, কমিশন প্রথা সর্বস্তরেই। এজন্য তৈরি হয়েছে একাধিক চক্র। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে এই চক্রে আছে সর্ষের মধ্যে ভূত।

- Advertisement -

এমনই একটি দুর্নীতি ২০১৮ সালে সামনে আসে সিবিআইয়ে তদন্তে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ওই তদন্তে জানা গিয়েছিল, সেনাবাহিনীর নিয়োগ পর্ষদের তত্ত্বাবধানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৩৪ জন অযোগ্য প্রার্থীকে অনৈতিকভাবে চাকরি দেওয়া হয়। আবার সেনাবাহিনীতে ধর্মশিক্ষার জন্য শিক্ষক নিয়োগে কিছু জুনিয়ার কমিশনড অফিসার প্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠলে এমন হইচই হয় যে, সিবিআই ওই ঘটনারও তদন্ত করে। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের চক্রে যেমন স্কুল শিক্ষক, সরকারি কর্মী আছেন, তেমনই যুক্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা। শুধু চুনোপুঁটি নেতা নন, জেলার শীর্ষস্তরের এমনকি রাজ্যের কিছু নেতাও এই চক্রের পান্ডা। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারিতেও অনেক রাজনৈতিক নেতা যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। এইসব চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বনাশ হচ্ছে বহু পরিবারের। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি তো হচ্ছেই না, উলটে আইনি জটে গচ্চা যাচ্ছে টাকা।

যদিও সরকারি কর্মসংস্থানে কোনও অসংগতি বা দুর্নীতির অভিয়োগ মানতে নারাজ কোনও সরকারই। প্রশ্ন করলে আমলা থেকে রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সবাই একবাক্যে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন। যেমন এরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, সরকারি নিয়ম মেনে স্বচ্ছতার সঙ্গেই নিয়োগ হচ্ছে। মনগড়া অভিযোগ তুললেই সেটা সত্য হয়ে যায় না। মন্ত্রী-আমলারা হাত ধুয়ে ফেললেও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ কিন্তু বাড়ছে রাজ্যে। একে তো বছরের পর বছর নিয়োগ বন্ধ। তার ওপর ছিটেফোঁটা যেটুকু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে, সেখানে টাকা ছাড়া চাকরির কোনও সুয়োগ নেই। এতে চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে রাজ্যে এখন বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তেমনভাবে সংবাদ শিরোনামে উঠে না এলেও নিয়োগে দুর্নীতির প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। কমিশন, কাটমানি প্রথার পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগের প্রতিবাদে ধীরে ধীরে একজোট হচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

ইতিমধ্যে রাজ্যে তাঁরা বেশ কয়েকটি সংগঠন তৈরি করেছেন। রাস্তায় নেমে আন্দোলন তো হচ্ছেই, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারি নিয়োগে দুর্নীতি ঘিরে উপচে পড়ছে ক্ষোভ। তার ভিত্তিতে মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা। নিয়োগে দুর্নীতি প্রতিবাদ মঞ্চ-এর রাজ্য কমিটির আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রায় প্রতিটি নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। আমরা বিভিন্ন জেলায় কমিটি তৈরি করেছি। পুজোর আগে কলকাতায় প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। শিক্ষিত বেকারদের একটা বড় অংশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অসন্তোষের প্রতিফলন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পড়লে ভুগতে হবে সরকার পক্ষকে।

ডব্লিউবিসিএস-এর মতো প্রশাসনিক পদে নিয়োগের পরীক্ষায় কারচুপি বা দুর্নীতি হওয়ার সুযোগ নেই, সাধারণভাবে এতদিন এমন ধারণা ছিল সকলের। ২০১৭ সালের ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষার মেইনসে প্রথম হওয়া প্রার্থীর নম্বর কেলেঙ্কারি সেই ধারণাটিকেও ভেঙে দিয়েছে। ওই নম্বর কেলেঙ্কারি এখন কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন, একসঙ্গে দুটি মামলা চলছে। সম্প্রতি আরটিআইয়ের ফলে প্রাপ্ত তথ্য ওই কেলেঙ্কারি নিয়ে একেবারে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। আরটিআই-এর ওই তথ্যে জানা গিয়েছে, বিতর্কিত ওই প্রার্থী প্রিলিমিনারিতে পাশই করতে পারেননি। অথচ মেইনসে পরীক্ষার পর ইন্টারভিউ দিয়ে এখন চাকরিও পেয়ে গিয়েছেন। উত্তরবঙ্গেই তিনি কর্মরত এখন। এই ঘটনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ জোরালো পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে। যদিও বিষয়টি সম্পর্কে মন্ত্রী বা আমলা, কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি।

আপার প্রাইমারিস্তরে শিক্ষক নিয়োগেও বেনিয়মের অভিযোগ আদালতের বিচারাধীন। গত বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি মৌসুমি ভট্টাচার্যের এজলাসে ভিডিও কনফারেন্সে ওই মামলার শুনানির পর বেনিয়ম সংশোধন করে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করার ব্যাপারে আইনজীবীদের মতামত চাওয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে। আপার প্রাইমারিস্তরে শিক্ষক নিয়োগের মেধাতালিকায় কারচুপির অভিয়োগে ওই মামলা। অন্যদিকে, সরকার নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক পদে নিয়োগ হচ্ছে বলে অভিযোগ। এটা পুরোপুরি বেআইনি বলে অভিযোগ করছেন কর্মপ্রার্থীরা।        কীভাবে ওই নিয়োগ হচ্ছে, তার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেননি স্কুল সার্ভিস কমিশনের কর্তারা। বিভিন্ন জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক পদেও কিছু কিছু নিয়োগ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মনে করা হচ্ছে, এই নিয়োগের পিছনেও নানা অসংগতি আছে। সেই কারণে শেষ পাঁচ বছরে কোন স্কুলে, কারা কবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, কোন বছরের পরীক্ষায় তাঁরা পাশ করেছিলেন, মেধাতালিকায় কত নম্বরে তাঁদের নাম ছিল ইত্যাদি তথ্য জানতে চেয়ে বিভিন্ন জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদগুলিতে তথ্য জানার অধিকার আইনে প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে। কোনোটিরই উত্তর মেলেনি এখনও। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদগুলির এই নীরবতাই অভিযোগকে আরও দৃঢ় করছে।

অসংগতির অভিযোগ আছে মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগেও। সাত বছর আগে রাজ্যের ৬১৪টি মাদ্রাসার জন্য ৩,১৮৩টি শিক্ষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। পরীক্ষা হয় ২০১৪ সালে। ফলাফল প্রকাশ করতে সময় গড়িয়ে যায় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ৮৮ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩,৭০৬ জন পাশ করেন। ইন্টারভিউতে উপস্থিত হন ৩,২০০ জন। কিন্তু নিয়োগ আর হয়নি। ২০১৮ সালে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন মাত্র ১,৫০০ পদের নিয়োগ করে চাকরি প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে দেয়। ইতিমধ্যে শূন্যপদ বাড়তে বাড়তে ৭,০০০-এ পৌঁছেছে। গত বছর চাকরিপ্রার্থীরা কলকাতায় অনশনে বসেছিলেন। সেই অনশন ভেঙে দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগের নির্দেশ দিলেও মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তা কার্যকর করেনি। এরপর হাইকোর্টে মামলা হয়। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান অবশ্য জানিয়ে দেন, চাকরি দেওয়া যাবে না। যা করার করে নিক।

কলেজস্তরে আবার অধ্যাপকের চাহিদা মেটাতে স্টেট এইডেড টিচার নিয়োগ শুরু করেছে সরকার। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার নিয়োগ হয়ে গিয়েছে। উচ্চ ডিগ্রিধারীরা এর বিরোধিতা করছেন। ইউনাইটেড  স্টুডেন্টস অ্যান্ড রিসার্চ স্কলারস অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন তৈরি করে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও করেছেন তাঁরা। সংগঠনের সভাপতি জয়দেব পাত্র বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্ধারিত য়োগ্যতামানকে অগ্রাহ্য করে রাজ্য সরকার উচ্চশিক্ষিত ও য়োগ্যতাসম্পন্নদের বঞ্চিত করে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ৬০ বছর পর্যন্ত কলেজে পড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে একদিকে চাকরির সুযোগ কমছে, অন্যদিকে কলেজ সার্ভিস কমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাশ করে ওয়েটিং লিস্টে থাকা হাজার হাজার যোগ্য চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া এইভাবে নিয়োগের ফলে কলেজ সার্ভিস কমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে অকেজো করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

রাজ্যের সমস্ত মাটি পরীক্ষাগারগুলিতে যোগ্যতামানের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন থেকে কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বাদ দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি দপ্তর। এনিয়ে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ইতিমধ্যে এই নির্দেশের প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন বেকার কর্মপ্রার্থীরা। মুখ্যমন্ত্রীর কৃষি পরামর্শদাতা প্রদীপ মজুমদার অবশ্য সাফাই দিয়েছেন, আইনি জটিলতার কারণে অবসরপ্রাপ্তদের কাজে বহাল করতে হয়েছে।