পরিবহণ দপ্তরে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, চুপ সব দলই

552

রণজিৎ ঘোষ : আর্থিক দুর্নীতি যেন কিছুতেই শিলিগুড়ির পিছু ছাড়ছে না। একটি সরকারি দপ্তরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মোটা টাকার খেলা চলছে। হ্য়াঁ, এই চিত্র কোর্ট মোড়ের ট্রেজারি ভবনের তিনতলায় থাকা পরিবহণ দপ্তরের। এখানকার অতিরিক্ত আঞ্চলিক পরিবহণ আধিকারিকের অফিসের চিত্রটা ৮-১০টি জেলার চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। কেন বলছি একথা? আসলে এখানে মোটা টাকার ঘুষ ছাড়া আপনি কোনও কাজই করাতে পারবেন না। অফিসের প্রত্যেকটি বিভাগেই দুর্নীতি বাসা বেঁধে রয়েছে। তা সে দপ্তরের আধিকারিকের চেম্বারই হোক বা মোটর ভেহিকল ইনস্পেকটরদের চেম্বার। সর্বত্রই দালালদের অবাধ যাতায়াত। আর শুধু বহিরাগত দালালরা নয়, যে সরকারি কর্মচারীরা এখানে বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বে রয়েছেন তাঁদের সিংহভাগের ভূমিকাও বিতর্কিত। পয়সা ফেকো, তামাসা দেখো, এই নীতিতে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

ধরুন আপনি একটি মোটরবাইক বা চার চাকার গাড়ি কিনবেন। একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য শিলিগুড়ির পরিবহণ দপ্তরে গেলেন। অফিসের চৌকাঠে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক থেকে আপনাকে ছেঁকে ধরবে দালালরা। ঠিক যেন মাছ বাজার। কী কাজ রয়েছে, লাইসেন্স করবেন, এ বলবে আমাকে দিন, ও বলবে আমাকে দিন। কিন্তু কত টাকা দিতে হবে? সরকারি নিয়মে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য সমস্ত নথিপত্র জমা দিলে সাতদিনের মধ্যে লার্নার দেওয়া হয়। সেইজন্য ২৪০ টাকা ফি দিতে হয়। এর এক মাস পরে আরও ৫৪০ টাকা ফি নিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হবে। কিন্তু শিলিগুড়িতে শেষ কবে সরকার নির্ধারিত এই ৭৮০ টাকা ফি দিয়ে কেউ লাইসেন্স বানিয়েছেন মোমবাতি জ্বালিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। পরিবহণ দপ্তরেই সেদিন এক বহিরাগত বলছিলেন, ওসব সরকারি ফি ভুলে যান দাদা। এখানে এখন আর চলে না, আমাদের অনেক দিক দেখতে হয়। ৩০০০ টাকা লাগবে। এক মাসের মধ্যেই লাইসেন্স পেয়ে যাবেন। কোনও ট্রায়াল দিতে হবে না। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট যে, শুধু তাঁরাই ওই টাকা পকেটে ভরেন না, ভাগ অফিসের ওপরতলা থেকে শুরু করে অনেক জায়গাতেই যায়। একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করতেই যদি ৭৮০ টাকার জায়গায় ৩০০০ টাকা দিতে হয় তাহলে লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ, ফিটনেস, মালিকানা বদল সহ অন্যান্য যাবতীয় কাজে কী পরিমাণ প্রণামি দিতে হচ্ছে ভাবুন একবার।

- Advertisement -

দূষণ শংসাপত্র পেতে বেশ কিছুদিন থেকেই শিলিগুড়িতে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দূষণ পরীক্ষার বিষয়টি অনলাইনে হয়ে যাওয়ার পর বহু গাড়িরই দূষণ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ, বহু গাড়ির নথিপত্র পরিবহণ দপ্তর অনলাইনে আপলোড করেনি। আবার পলিউশন সার্টিফিকেট আপ টু ডেট না থাকলে রাস্তায় গাড়ি ধরে পুলিশ জরিমানা করছে। পরিবহণ দপ্তরের চূড়ান্ত গাফিলতির জেরে মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। কারণ এই নথিপত্র আপলোড করার দাযিত্ব তো তাদেরই। অথচ এই সমস্যা নিয়ে অফিসে গেলেই ২০০-৩০০ টাকা করে নিয়ে সেই গাড়ির নথি এক মিনিটে আপলোড করা হচ্ছে। কাকে বলবেন, কার কাছে বিচার চাইবেন, আপাদমস্তক সবাই তো এই দুর্নীতিচক্রের সঙ্গে যুক্ত। এখন তো আবার শুনছি, দার্জিলিং থেকে এক কর্তা এই অফিসের দালালচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। কেননা, তিনি একটা সময় শিলিগুড়ি অফিসের দায়িত্বে ছিলেন। এখন দার্জিলিংয়ে, কাজেই অফিসের পুরো চক্র তাঁর হাতের মুঠোয় রয়েছে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুর্নীতি তো আজ নতুন নয়। বহু বছর ধরে চলে আসছে। কেন শাসক বা বিরোধী কোনও দলই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় না? তণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা কি জানেন না ওই অফিসে কী হচ্ছে? নাকি সিপিএম নেতারা কিছু জানেন না? আসলে সবার এখানে হিসাব রয়েছে। এই দালালদের নিয়ে ইউনিয়ন তৈরি দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। যত পারো মানুষকে শোষণ করো, আর মিটিং-মিছিল হলে পার্টি ফান্ডে লক্ষ লক্ষ টাকা দিলেই সব পাপ মাফ। তাতে মানুষ দুর্ভোগে পড়লেও তাদের কিচ্ছু যায় আসে না।