গাছই সন্তান, বাগান বাঁচাতে ৩০ লক্ষ টাকার বাঁধ 

31

সুভাষ বর্মন ও শিবশংকর সূত্রধর, ফালাকাটা ও কোচবিহার: প্রথম কন্যাসন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। সন্তানশোক ভুলতে গাছকেই সন্তানের মতো পালন শুরু করেছিলেন ফালাকাটার পূর্ব কাঁঠালবাড়ির দম্পতি কল্লোল ও আলপনা দে। গত দশ বছরে ৬ বিঘা জমিতে লাগিয়েছেন কয়েক হাজার গাছ। বাকিটা জীবন এই সন্তানদের নিয়ে কাটিয়ে দিতে চান তাঁরা। কয়েক হাজার গাছ লাগানোর খবরে অবাক হচ্ছেন হয়তো। এ রকমই অবাক হতে পারেন আরেক গাছপ্রেমীকে দেখলে। পরিবেশ দিবসে উদ্বুব্ধ হতে পারেন পরিবেশ-প্রেমে। ইনি কোচবিহারের রাকেশ সরকার।

নদীভাঙনের হাত থেকে গাছ বাঁচাতে গোটা জীবনের উপার্জিত প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা খরচে বাঁধ তৈরি করেছেন। তিনি জেনকিন্স স্কুলের শিক্ষাকর্মী। ক্যারাটের কোচও। তাঁর কোচিংয়ে বহু ক্যারাটেকা বিভিন্নস্তরে সোনার পদক জিতেছেন। ফালাকাটা-সোনাপুর জাতীয় সড়কের শালকুমার মোড়ের পাশে পূর্ব কাঁঠালবাড়ি গ্রামে বাড়ি কল্লোলের। বছর দশেক আগে তাঁদের সাত বছরের মেয়ে শ্রবণার মৃত্যু হয়। সন্তান হারানোর বেদনা ভুলতেই গাছ লাগানো শুরু। কল্লোলের কথায়, বর্ষাকাল হল বৃক্ষরোপণের সময়। প্রতিবার পরিবেশ দিবস থেকেই গাছ লাগানো শুরু হয় আমাদের। তাই এখন চরম ব্যস্ততা।

- Advertisement -

কল্লোল ও আলপনার ৬ বিঘা জমিতে মোট কত হাজার গাছ? তাঁদেরই স্পষ্ট কোনও হিসেব নেই। কল্লোল হিসেব দিলেন, ৬০টি প্রজাতির গাছ তাঁরা লাগিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, সেগুন, কদম, নিম, গামারি, নারকেল, সুপারি, বিলিতি আমড়া, মিষ্টি কামরাঙা, চেরি, কাঠ লিচু, কাজুবাদাম, কলা, লেবু, রকমারি প্রজাতির পেয়ারা। এখন চার বছরের পুত্রসন্তান রয়েছে এই দম্পতির। উদ্ভিদ প্রেম কী, তা ওই একরত্তিকেও বুঝিয়ে দিচ্ছেন বাবা-মা। গত বছর থেকেই স্কুল বন্ধ। তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে সে-ও এখন বাগান পরিচর্যার কাজে শামিল।

রাকেশের গাছের প্রতি ভালোবাসা কী করে জন্মাল?
গাছের প্রতি ভালোবাসার জন্যই তিনি ২০১৩ সালে কোচবিহার শহর সংলগ্ন গুড়িয়াহাটি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেব কলোনির লংকাবরে তিন বিঘা জমি কেনেন। ৫০০ গাছ লাগান। মরা তোর্ষা নদীর ভাঙনে ২০১৯ এবং ২০২০ সালে প্রায় ৫০টি গাছ ভেসে যায়।

রাকেশকে বলতে শোনা গেল, শুধু গাছ বাঁচানোর জন্যই বাঁধ তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। নিজের জমিতেই বাঁধটি দেওয়া হয়েছে। পুরো জমির যা দাম, বাঁধ তৈরিতে তার তিনগুণ বেশি টাকা খরচ হয়েছে।  বাঁধটি তৈরি না করলে অন্যখানে আমার এই জমির তিনগুণ বেশি পরিমাণে জমি কিনতে পারতাম।

ফালাকাটার কল্লোল যুক্ত একটি পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সঙ্গে। এলাকায় কোথায় কী কী প্রজাতির গাছ, কোন কোন গাছ হারিয়ে যাচ্ছে, মাটির চরিত্র, পশুপাখির বিচরণ নিয়ে সমীক্ষাও করেছেন। তাঁর কথায়, হারিয়ে যাওয়া গাছ সংরক্ষণের চেষ্টাও করছি। শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থে নয়, পাখির জন্যই বহু প্রজাতির ফুল ও ফল গাছ লাগিয়েছি। এজন্য বাগানে পাখির কলরব লেগেই থাকে।
তাঁর স্ত্রী আলপনা শেষকথাটা বলে দিলেন- এই গাছ বাগানেই আজীবন থাকতে চাই।