নির্দেশ মানছে না বেসরকারি হাসপাতাল

291

শিলিগুড়ি : সরকারি নির্দেশের পরেও শিলিগুড়ির বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোম করোনায সংক্রামিত বা সন্দেহজনক রোগীকে ভর্তি নিচ্ছে না। তেমনই নার্সিংহোম বা এই হাসপাতালগুলির চিকিৎসক, নার্স সহ অন্য কোনও কর্মী করোনায সংক্রামিত হলে তাঁর সংস্পর্শে আসা বাকিদের কোয়ারান্টিনে পাঠানো হচ্ছে না। ফলে শহরে হুহু করে করোনার সংক্রমণ যেমন বাড়ছে, তেমনই নার্সিংহোমগুলির ঝাঁপ বন্ধ হওয়ার মুখে। প্রশ্ন উঠেছে, সমস্ত আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলা বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? দার্জিলিংযে জেলা শাসক এস পন্নমবলম বলেন, ‘কিছু নার্সিংহোমে চিকিৎসা হচ্ছে, কয়েকটি নার্সিংহোম সময় চেয়েছে। আমরা বিষযটি নিযে নজর রাখছি। আরও কয়েকদিন দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ দার্জিলিংযে মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ প্রলয আচার্য বলেন, ‘আমরা বিষয়টা খতিয়ে দেখছি। কোনও লিখিত অভিযোগ থাকলে জানান।’

চিকিৎসক মহলের একাংশ বলছেন, ব্যবস্থা নেবে কে? সর্ষের মধ্যেই তো ভূত লুকিয়ে রয়েছে। নার্সিংহোম কর্তাদের সঙ্গে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক রয়েছে। সারাবছর যাঁদের সঙ্গে বোঝাপড়া রয়েছে, এই সময় আইন না মানলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস এখানকার স্বাস্থ্যকর্তাদের নেই। ফলে স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশ মেনে একটা নির্দেশিকা জারি করেই চুপ জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। তা কার্যকর হচ্ছে কি না, মানুষ সঠিক পরিষেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে কিছু যায় আসে না স্বাস্থ্যকর্তাদের। যার ফল ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

- Advertisement -

শিলিগুড়ির বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিতে যাতে করোনা সংক্রামিত রোগীর চিকিৎসা হয় সেই চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব বৈঠক করে আবেদন করেছেন। পরবর্তীতে দার্জিলিংয়ের জেলা শাসক, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক আবেদন করেছেন। উত্তরবঙ্গে কোভিড-১৯এর দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) ডাঃ সুশান্ত রায় নার্সিংহোম ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে নিয়ে বৈঠক করে করোনার চিকিৎসার আবেদন করেছেন। কিন্তু নানা অজুহাতে তারা চিকিৎসায় রাজি হয়নি। এরপর গত ২৬ জুন দার্জিলিংযে মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শহরের ১৬টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমকে একটি চিঠি পাঠিয়ে ১০ শতাংশ শয্যা করোনার চিকিৎসার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে রাখার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশিকা পেয়ে নার্সিংহোম এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলি কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা ২৯ জুন দুপুরের মধ্যে তাঁকে লিখিতভাবে জানানোর নির্দেশও দিয়েছিলেন মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়া কতদূর এগোল, প্রত্যেকটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোম তার জবাব দিয়েছে কি না সে ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্তারা কিছুই জানাতে চাইছেন না।

বাস্তব চিত্র বলছে, প্রধাননগর এবং মাটিগাড়ার একটি করে বেসরকারি হাসপাতাল সহ শহরের তিন-চারটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা সংক্রামিত রোগীদের রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাকিগুলিতে এখনও আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু হয়নি। করোনা সংক্রামিত রোগী দূরে থাক, জ্বর, সর্দিকাশি সহ করোনার উপসর্গ নিয়ে কোনও রোগী এলেও তাঁদের চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রধাননগরের একটি বড় নার্সিংহোম থেকে দুদিন আগে এক প্রসূতিকে এভাবেই উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে রেফার করে দেওযার অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রসূতিতে সিজার করার জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পরই সেখানে রিপোর্ট আসে যে ওই প্রসূতি করোনায় সংক্রামিত। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সেখান থেকে বের করে অ্যম্বুল্যান্সে করে মেডিকেলে পাঠিযে দেওয়া হয়। কেন শহরে এই অব্যবস্থা, কেন প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে রয়েছে সেই প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।

এদিকে একাধিক নার্সিংহোমে ইতিমধ্যেই চিকিৎসক, নার্স সহ অন্য কর্মীরা সংক্রামিত হয়েছেন। খালপাড়া, সেবক রোড ও প্রধাননগরে একটি করে নার্সিংহোমের চিকিৎসক, নার্স সহ অন্য কর্মীরা করোনা সংক্রামিত হয়েছেন। অথচ প্রথম সংক্রামিতের সংস্পর্শে আসা কর্মীদের চিহ্নিত করে তাঁদের কোয়ারান্টিনে নেওয়া হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলিতে সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। খালপাড়ার একটি নার্সিংহোমে এখনও পর্যন্ত এক চিকিৎসক, সাতজন নার্স সহ ১৩ জন সংক্রামিত হয়েছেন। ওই নার্সিংহোমের একটি শিশুর শরীরেও করোনা সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে। চিকিৎসকদের একটি মহলের দাবি, কোযারান্টিন না করে এভাবে কর্মীদের করোনা সংক্রামিত হতে সাহায্য করা হয়েছে। এটা গুরুতর অপরাধ। কেন স্বাস্থ্য দপ্তর সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সেই প্রশ্ন উঠেছে।

ছবি- শিলিগুড়িতে সংক্রমণ রোধে স্প্রে করা হচ্ছে।

তথ্য- রণজিৎ ঘোষ, ছবি- ভাস্কর বাগচী