গর্ভাবস্থায় নিরাপদ কোভিড ভ্যাকসিন

150

কোভিড মোকাবিলায় যখন টিকা দেওয়া শুরু হল, সেই সময় গর্ভবতী মহিলা বা ল্যাকটেটিং মায়েদের টিকা নেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবার ও স্বাস্থ্যকল্যাণমন্ত্রক জানিয়েছে যে, গর্ভবতী মহিলারাও টিকা নিতে পারবেন। এটা একদিকে যেমন হবু মায়েদের জন্য স্বস্তির খবর, তেমনই অনেকে যথেষ্ট উদ্বেগে রয়েছেন। কারণ একসময় যে টিকায় ছিল নিষেধাজ্ঞা, সেই টিকাই এখন কতটা নিরাপদ হবে, উঠছে প্রশ্ন। সংশয় দূর করার চেষ্টা করেছেন উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনিকলজিস্ট
ডাঃ সন্দীপ সেনগুপ্ত

প্রথমেই বলি, যখন যে কোনও ড্রাগস বা ভ্যাকসিন বেরোয়, তখন প্রধান লক্ষ্যই থাকে, কাদের দেওয়া হবে আর কাদের দেওয়া হবে না। বিশেষ করে প্রেগন্যান্সি, ল্যাকটেশন এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অনেক ট্রায়াল বা আলোচনা-পর্যালোচনার পরই অনুমতি  দেওয়া হয়।

- Advertisement -

যখন প্রথম ভ্যাকসিন আসা শুরু হল, তখন মানুষের, বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের বেশ কিছু উদ্বেগ ছিল। কারণ গর্ভাবস্থায় ইমিউনিটি কম থাকে। আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম মানেই কোভিডে সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যার জন্য বারবার ইমিউনিটির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যাইহোক, শিশুর উপরে কোভিডের তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। সুতরাং, গর্ভবর্তী মহিলা কোভিডে সংক্রামিত হলে সেটা কখনোই গর্ভাবস্থার সমাপ্তি নয়।

অন্যদিকে, গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা একটু বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ হাইপার কোয়াগুলেবল স্টেট। গর্ভাবস্থায় কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে দুএকটা সেরোজিক্যাল টেস্ট রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, কারও থ্রম্বোসিস (রক্ত জমাট বাঁধা) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সেজন্য গর্ভবতী মহিলাদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে কিনা, সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা খানিক সংশয়ে ছিলেন। যদিও পরবর্তীতে দেখা গিয়েছে, ব্যাপারটা আদৌ সেরকম কিছু নয়। আসলে কোভিশিল্ডের রিপোর্টগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।

কোভিডের ক্ষেত্রে যেমন মডারেট টু সিভিয়ার ডিজিজ হতে পারে, নিউমোনিয়া হতে পারে, সুস্থ হলেও মৃত্যুহার ১.৫-২ শতাংশ হতে পারে বা পোস্ট কোভিড মরবিডিটি যেমন, পোস্ট কোভিড নিউমোনিয়া, পোস্ট কোভিড ডিপ্রেশন হতে পারে, তেমনই গর্ভাবস্থায় কোভিড হলে হাইপারটেনশন বেশি হতে পারে। এই অবস্থাকে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া বলে। ফলে প্রিটার্ম লেবারের সম্ভাবনা বেশি। প্রিটার্ম লেবার অর্থাৎ প্রিম্যাচিওর বেবি। প্রিটার্ম লেবার হলে সিজারিয়ানের সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে বাচ্চার জন্ডিস হওয়া, সেপসিস হওয়া বা কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হল, উপরিউক্ত সমস্যা মাথায় রেখে ভ্যাকসিন দিয়ে লাভ বেশি, নাকি না দিলে ক্ষতি বেশি? এক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, না দিলে অবশ্যই ক্ষতি বেশি, দিয়ে ক্ষতি হওয়ার তুলনায়। দেখুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের ভ্যাকসিনেশনের পক্ষেই ছিলেন। শুধু তাই নয়, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো দেশে অনেক আগেই গর্ভবতী মহিলাদের টিকাকরণ চালু হয়ে গিয়েছিল। তাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর কিছু দেখা যায়নি। যাঁরা মাতদুগ্ধ খাওয়ান, তাঁদের মধ্যেও সেরকম কোনও প্রভাব ছিল না।

আমরা তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের দেশগুলিকে অনুসরণ করে থাকি। তাই বিদেশে যখন গর্ভবতীদের টিকাকরণ শুরু হল, তখন ভারতও নড়েচড়ে বসল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করা শুরু করে ফগসি (ফেডারেশন অফ অবস্টেট্রিক অ্যান্ড গাইনিকলজিক্যাল সোসাইটিস অফ ইন্ডিয়া)। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, ফগসি হল ভারতের প্রথম প্রফেশনাল মেডিকেল বডি, যারা কোভিড যখন শুরু হয়েছিল, তখন একটা গাইডলাইন বের করে ভারত সরকার বা আইসিএমআর-কে দিয়েছিল। যাইহোক, গর্ভাবস্থায় টিকাকরণ কতটা সুরক্ষিত, সেই সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় খতিয়ে দেখার পর ফগসি তাদের রিপোর্ট আইসিএমআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ)-কে দেয়। আইসিএমআর তাতে মান্যতা দেয় এবং ভারত সরকারকে জানায়। অবশেষে গর্ভবতী বা প্রসূতি মহিলাদের টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড়পত্র মেলে।

প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলারই টিকা নেওয়া উচিত। তবে গাইডলাইন এলে বোঝা যাবে যে, গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে টিকা দেওয়া যাবে কিনা। পাশাপাশি কারও যদি অ্যাক্টিভ অ্যালার্জি থাকে কিংবা কোভিশিল্ড বা কোভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়ে প্রচণ্ড অ্যালার্জি হয়, সেক্ষেত্রে বাদ রাখবেন এবং অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।