মডার্নার ভ্যাকসিন নিয়ে বুঝেছিলাম সাফল্য আসছে

1030
ছবি: সংগৃহীত।

মডার্নার ভ্যাকসিন নিয়ে বুঝেছিলাম সাফল্য আসছে| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal India

বর্ষণজিৎ মজুমদার

- Advertisement -

(অধ্যাপক, ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি)

নোভেল করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে গতকাল মডার্না যে অন্তর্বর্তীকালীন ফেজ-৩ ট্রায়াল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই mRNA ভ্যাকসিন অন্তত কার্যকরভাবে মানবদেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিতে পেরেছে। আমি নিজে আরও বেশি করে মডার্নার ভ্যাকসিন নিয়ে আশাবাদী। কারণ কয়েমাস আগেই আমি এই প্রোগ্রামের অন্তর্গত হয়ে নিজের শরীরে পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন নিই। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পরে, প্রবল কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল। তার সঙ্গে দুদিন ধরে গায়ে ব্যথা। কিন্তু আমার রক্তের সিরামের এলাইজা টেস্ট করে ভালো প্রতিরোধী ক্ষমতা (ইমিউনো রেসপন্স) পেয়েছিলাম। মানে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিজেন তৈরি হয়েছিল। তাই এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। ফেজ-৩ ক্লিনিকাল ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট আমার ধারণাকেই ঠিক প্রমাণ করল।

অবশ্য শুধু মডার্না নয়, খুব ভালো ফল দেখিয়েছে ফাইজার-এর ভ্যাকসিনও। যদিও দুটোই mRNA ভ্যাকসিন, কিন্তু ফাইজার আর মডার্নার ভ্যাকসিনের মধ্যে অনেকটাই তফাত আছে। মডার্নার ভ্যাকসিনকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও তা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকতে পারে। কিন্তু ফাইজার-এর ভ্যাকসিন দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে হলে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন হবে। শুধু তাই নয়, মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ভ্যাকসিন তরল রূপ দেওয়ার পর মডার্নার ভ্যাকসিন ৩০ দিন পর্যন্ত সাধারণ রেফ্রিজারেটারে কার্যকর থাকতে পারে। বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল সায়েন্স থেকে কয়েকটা লাইন অনুবাদ করে দিলাম- মূল পার্থক্যটা হল এইরকম যে ফাইজার/বায়োনটেক-এর ভ্যাকসিন অবশ্যই মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করতে হবে। সেখানে মডার্নার ভ্যাকসিন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা যাবে। মডার্না জানিয়েছে, তরল রূপ দেওয়ার পর এই ভ্যাকসিন ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়ির রেফ্রিজারেটারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

মডার্নার ভ্যাকসিনের এই বিশেষত্ব ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকটাই সুবিধাজনক হবে। আমি আগেই বলেছিলাম, mRNA ভ্যাকসিনের স্থায়িত্ব বাড়ানো সম্ভব হবে নিউক্লিওটাইড কনজুগেশন কেমিস্ট্রির গবেষণার মাধ্যমে। মডার্না সেটা সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছে। এই mRNA ভ্যাকসিনের আরও একটা সুবিধা আছে। এই ভ্যাকসিনে নোভেল করোনা ভাইরাসের s প্রোটিনের জিন সংকেত সরাসরি কোষের সাইটোপ্লাজমে ঢুকে যায়। নিউক্লিয়াসে যাওয়ার কোনও অবকাশ বা প্রয়োজন পড়ে না তার। সাইটোপ্লাজমে থাকা কোষের প্রোটিন তৈরির যন্ত্র রাইবোজম অনায়াসে ভাইরাসের প্রোটিন বানিয়ে ফেলে। কোষের মেমব্রেন, যেখানে অ্যান্টিজেন সমৃদ্ধ কোষ থাকে তার সঙ্গে এই প্রোটিনের সংযোগ ঘটে। ঠিক এভাবেই সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে প্রতিরোধী ক্ষমতা কাজ করে।

এই সময় আমেরিকায় মহামারি আবার প্রবল আকার নিয়েছে। তবে আগে যেটা বলেছিলাম সেটা আবার বলছি, ভ্যাকসিনের সার্থক ফেজ-৩ ট্রায়ালের জন্য মহামারির প্রকোপ থাকা জরুরি। সেই কারণেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমেরিকায় চলতে থাকা স্টেজ-৩ ট্রায়াল সফল হবে। আশা করছি ভারতে এই মুহূর্তে ভাইরাল ব্যাকবোন বেসড ও প্রোটিন ব্যাকবোন বেসড যেসব ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে তার সংখ্যা বাড়ানো হবে। এটাই আদর্শ সময়। কারণ, এই ব্যাকবোন বেসড ভ্যাকসিনের বেশি তাপমাত্রাতেও স্থায়িত্ব রয়েছে। মডার্নার ভ্যাকসিনের তাপমাত্রায় স্থায়িত্ব যেহেতু বেশি তাই ভারতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা যেতেই পারে। তবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করবে নীতি নির্ধারকদের ওপর। ভারতে একটা ভালো নিয়ম আছে বলে শুনেছি। কোনও ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে হলে ওখানে প্রথমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা করতে হয়। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ভারতে ক্লিনিকাল ট্রায়াল হচ্ছে বলে শুনলাম। কিন্তু মডার্নার mRNA ভ্যাকসিন ট্রায়ালের কথা ঠিক জানি না। তবে, একটিমাত্র ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করা কখনও ঠিক নয়। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের ফল খুবই ভালো। আশা করছি ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে তা কার্যকর ভমিকা নেবে। কিন্তু আরও কয়েকটা বিকল্প থাকা উচিত। ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির গোড়া থেকে আমরা আমেরিকায় এই পরীক্ষার সুফল পেতে শুরু করব, এমনই আশা আমার। অবশ্যই স্বাস্থ্যকর্মী, কোভিড যোদ্ধা, বয়স্ক ও কোমরবিডিটি আছে এমন মানুষকে আগে ভ্যাকসিন দিয়ে সুরক্ষিত করা হোক, এটাই চাই। বিজ্ঞানে ভরসা রাখুন। আমরা আবার কাছাকাছি আসব। আবার বলছি, এই রিপোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন এবং দিগন্তে কোভিডমুক্ত পৃথিবীর সূর্যটা ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে।