সুস্থ হয়েও বয়কটের মুখে যুবক

397

বালুরঘাট : শরীরে করোনার থাবা। আর তার জেরে সপরিবারে সামাজিক বয়কটের মুখে পড়তে হল বালুরঘাটের এক যুবককে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে প্রতিবেশীরা তো বটেই, পরিজনরাও মুখ ফিরিয়ে নেন। বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করেন পাড়াপড়শিরা। সামাজিকভাবে  তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখে পড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও ধাক্কা আসে। কাজটাও হারাতে হয় বালুরঘাটের ওই যুবককে। তবে চারিদিকে প্রতিকূল পরিবেশ থাকলেও হার মানেননি তিনি। ঠিক করেন, লড়াইটা করোনার বিরুদ্ধে। সেই লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি শুরু করে দেন। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুকুমার দে বলেন, ‘দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটে করোনা য়োদ্ধা ক্লাব তৈরি করা হয়েছে। খুব দ্রুত এই ক্লাবের সদস্যরা কাজে নামবেন।’

লড়াইয়ে সুযোগটা করে দেয় স্বাস্থ্য দপ্তর। মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতায় করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল করা হয় বালুরঘাটের ওই যুবককে। তিনি পিছপা হননি। মানুষের মধ্যে থেকে করোনা নিয়ে নানা ভুল ধারণা তাড়াতে তিনি এখন বদ্ধপরিকর। ইতিমধ্যেই বালুরঘাটে গড়ে তোলা হয়েছে করোনা যোদ্ধা ক্লাব। আপাতত বালুরঘাট শহর ও গ্রামীণ এলাকার পাঁচজন করোনা জয়ীকে নিয়ে এই ক্লাব তৈরি করা হয়েছে। আগামীদিনে জেলাজুড়ে এই ধরনের ক্লাব তৈরি করা হবে বলে স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।

- Advertisement -

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে নির্দেশিকা আসার পরেই দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় করোনা য়োদ্ধা ক্লাব তৈরির প্রক্রিয়ায় হাত দেয় প্রশাসন। যাঁরা করোনাকে জয় করে বাড়ি ফিরেছেন, এমন মানুষদের নিয়ে এই ক্লাব তৈরি হচ্ছে। নতুন করে যাঁরা সংক্রামিত হচ্ছেন, সেই সব মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মনোবল বাড়াতে ও সচেতনতামূলক প্রচারের কাজ করবেন এই ক্লাবের সদস্যরা। করোনা হলেই যে মৃত্যু হবে এমন ধারণা বাসা বেঁধেছে অনেকের মনে। এই ধারণার ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। সংক্রামিত ও তাঁদের পরিবারকে একঘরে করে রাখার মানসিকতাও দেখা যাচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সচেতনতামূলক প্রচারই হাতিয়ার স্বাস্থ্য দপ্তরের। আর সেই কাজটাই করবেন করোনা যোদ্ধা ক্লাবের সদস্যরা। করোনাকে হারানো সম্ভব, এই মানসিক জোরের কথাই এই ক্লাবের সদস্যরা বোঝাবেন নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে।

এদিকে লাগামছাড়া সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দিতে কোভিড মনিটরিং সেল গঠন করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীদের নিয়মিত মনিটরিং করবে এই সেল। এই সেলের মাধ্যমে রোগীরা সরাসরি চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। রোগীদের দুটি ফোন নম্বরও দেওয়া থাকবে। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় করোনা সংক্রামিতের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। জেলাবাসীর মধ্যে করোনা নিয়ে যথেষ্ট আতঙ্ক রয়েছে। বিশেষ করে কোনও এলাকায় কেউ সংক্রামিত হলে, সেই এলাকায় ওই পরিবার অলিখিত সামাজিক বয়কটের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এমনকি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পরেও এলাকাবাসী তাঁদের যেমন বাঁকা চোখে দেখছেন, তেমনই তাঁদের সাধারণ জীবনযাপনে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এসব বিষয়ে নজর পড়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের। এরপরই করোনা যোদ্ধা ক্লাব তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই ক্লাব গঠনের মধ্যে দিয়ে যেমন সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষেরা সামাজিকভাবে পুনর্বাসন পাবেন, তেমনই তাঁদের মধ্যে দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় এই ধরনের ক্লাব গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সদর শহর বালুরঘাটে পাঁচজন সদস্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে করোনা যোদ্ধা ক্লাব। এর মধ্যে যেমন আইনজীবী রয়েছেন, তেমনই শিক্ষক ও অন্য পেশার মানুষও রয়েছেন। আগামী অগাস্ট মাসের প্রথম থেকেই এই ক্লাব তাদের কাজে নামবে বলে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে। এই ক্লাবের এক সদস্য বলেন, করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে তো দেখেনই, এমনকি সামাজিক বয়কটের মুখেও ফেলে দেন। এবিষয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। মানুষকে করোনার বিরুদ্ধে সচেতন করা ও নতুন করে যাঁরা সংক্রামিত হয়েছেন, তাঁদের মনোবল বৃদ্ধির যথায়থ প্রয়াস চালাব আমরা।

তথ্য- সুবীর মহন্ত