খোঁয়াড় পেতে লক্ষ লক্ষ টাকা ওড়ে বাংলাদেশ সীমান্তে

299

গৌতম সরকার, মেখলিগঞ্জ : সীমান্ত দিয়ে পাচারের আগে উদ্ধার হওয়া গোরু রাখার জন্য সরকারের উদ্যোগে বেশ কিছু খোঁয়াড় তৈরি করা হয়েছে। এখন সেই গোরুর খোঁয়াড় পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণির মানুষ। কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কয়েক বছর ধরেই খোঁয়াড়ের দাযিত্ব পেতে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে অনেকে। সম্প্রতি কুচলিবাড়িতে নিলামের সময় একটি খোঁয়াড়ের দর ৫৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ওঠে বলে জল্পনা ছড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আসলে ওই নিলামটি কত টাকায় হয়েছে, তা নিয়ে সকলে মুখে কুলুপ এঁটেছে। তবে সূত্রের খবর, খোঁয়াড় নিলামের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দর উঠলেও বাস্তবে সেই টাকা সরকারি হিসাবে দেখানো হয় না। আলোচনার মাধ্যমে যে যত টাকা বেশি দেবে, খোঁয়াড় পাওয়ার ক্ষেত্রে সে তত এগিয়ে থাকবে। এই অতিরিক্ত টাকার হিসেব সরকারি খাতায় থাকে না, কোনও প্রমাণও মিলবে না। কিন্তু সীমান্ত এলাকায় কেন খোঁয়াড়ের দর লক্ষ লক্ষ টাকা উঠছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এত টাকা দিয়ে খোঁয়াড় পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কী লাভ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। এই নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলেও খবর পেঁছেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তরফেও এই নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।

খোঁজখবর নিয়ে দেখা গিয়েছে, সীমান্তে যেসব গোরু উদ্ধার হয়, সেগুলি বিএসএফ ও পুলিশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট খোঁয়াড়ে পৌঁছায়। সেখানে গোরুগুলির নিলাম করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, নিলামের আগেই খোঁয়াড় থেকে উদ্ধার হওয়া গোরু ফের বাংলাদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য বহু গোরুকে মৃত বলে খাতায়-কলমে দেখানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, খোঁয়াড়ে গোরুগুলিকে রাখার জন্য সরকারের তরফে টাকা বরাদ্দ করা হয়। অভিযোগ, খোঁয়াড়ে গোরু না থাকলেও বা নির্দিষ্ট সংখ্যার থেকে কম গোরু থাকলেও প্রশাসনের থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এভাবেই গোরুকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার খেলা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু অভিযোগ ওঠাই নয়, এই বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।

- Advertisement -

এই পুরো চক্রের পিছনে কোনও বড় হাত এবং বাইরের মাফিয়াদের যোগ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার লেনদেন কীভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের একাংশ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত না থাকলে কোনওভাবেই এই চক্র চালানো সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের যোগসাজশেই খাতায়-কলমে সব হিসেব ঠিক থাকছে বলে অভিযোগ। ব্লকে ঠিক কতগুলি খোঁয়াড় রয়েছে, তার কোনও হিসেবই নাকি মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতি বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে নেই। মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাণী কর্মাধ্যক্ষ বাবুল হোসেন জানান, খোঁয়াড় থেকে এত গোরু মারা যাওয়ার ঘটনা তাঁকেও ভাবিয়ে তুলেছে। গোরু মজুতের হিসেব নিয়ে গরমিল রয়েছে বলে তাঁর কাছেও বারবার অভিযোগ আসছে। বাবুল জানান, কয়েকটি খোঁয়াড়ে গিয়ে কিছু অভিযোগ তাঁরও সত্যি মনে হয়েছে। গোটা বিষয়টির তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে ব্লকে কতগুলি খোঁয়াড় রয়েছে, এখনও কত গোরু নিলামের অপেক্ষায়, তার কোনও তথ্য তিনি দিতে পারেননি। বাবুলের বক্তব্য, এইসব তথ্য চেয়ে মিলছে না। প্রশাসনের একাংশ সব আড়ালের চেষ্টা করে যাচ্ছে। মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিয়তি সরকার জানান, গোরুর কারবার নিয়ে অনেকদিন থেকেই বহু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠছে। অনেকেই তাঁর কাছে অভিযোগ করেছেন, সঠিকভাবে তদন্ত হলে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ কারবারের হদিস মিলতে পারে। তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পঞ্চায়েত সমিতির বিদ্যুৎ কর্মাধ্যক্ষ বাপি চক্রবর্তীও। খোঁয়াড়ে কোনও গোরু মারা গেলে তার ডেথ সার্টিফিকেট ব্লক প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের তরফে দেওয়া হয়। কিন্তু খোঁয়াড়ে এত গোরু মারা যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মেখলিগঞ্জের প্রাণীসম্পদ বিকাশ আধিকারিক ডাঃ দেবাশিস বর্মনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ফোন ধরেননি। মেসেজেরও কোনও উত্তর দেননি। অভিযোগ প্রসঙ্গে কোচবিহারের জেলা শাসক পবন কাদিয়ান জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।