বাংলায় সিপিএম না দিল্লিতে তৃণমূল, সঙ্গী খুঁজতে দ্বিধায় কংগ্রেস

1020

বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা: বাম-কংগ্রেস জোট আদৌ কি হবে পশ্চিমবঙ্গে? বামেদের আগ্রহ ষোলো আনা। রাজ্য কংগ্রেসের বর্তমান নেতাদের অধিকাংশ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এই জোট গড়তে মরিয়া। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জোট প্রক্রিয়া চলছিল ভালোভাবেই। কিন্তু সম্প্রতি বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। একইভাবে কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে মুখ্যমন্ত্রীদের ওই বৈঠকে না ডাকায় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের মতিগতি নিয়ে সন্দিগ্ধ সিপিএম।

জল্পনা শুরু হয়েছে, বামেদের সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে এসব নেতিবাচক বার্তা নয় তো? তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যেভাবে সোনিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের ভার্চুয়াল বৈঠকে সক্রিয় ভমিকা নিয়েছেন, তাতে মনে করা হচ্ছে, সর্বভারতীয়স্তরে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্য রেখে চলতে চান। তাঁর এই পদক্ষেপের পিছনে যত না সর্বভারতীয় কারণ আছে, তার চেয়ে বেশি আছে রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পক্ষে প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ বিজেপি। দলের কাছে সংশয় হল প্রত্যাবর্তন, না আবার পরিবর্তন। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেত্রী বুঝতে পারছেন, বাম-কংগ্রেস জোট হলে রাজ্যে ত্রিমুখী লড়াই অনিবার্য। এখনও পর্যন্ত যা পরিস্থিতি রাজ্যে, তাতে মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি জেলার কিছু আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে বাম-কংগ্রেসের কিছু আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু চতুর্মুখী লড়াই হলে লাভ হবে বিজেপির। সেক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে তৃণমূল। ফলে তণমূল নেত্রী চাইবেনই যে তৃণমূল বিরোধী ভোট এমনভাবে ভাগাভাগি হোক, যাতে চাপে পড়ে বিজেপি। মুশকিল হল, রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব এখনও দলীয় হাইকমান্ডের মতিগতি বুঝতে পারছেন না।

- Advertisement -

বিজেপির চাপে বাম ও কংগ্রেসের একত্রিত লড়াইয়ে ভাবনার পিছনে সোমেনের অবদান ছিল। সেই কাজে তাঁকে সহযোগিতা করতেন রাজ্যসভা সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য ও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান। সোমেনের আকস্মিক প্রয়াণে দল কিছুটা নেতৃত্বহীনতায় ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে যেভাবে সোনিয়া গান্ধি বিরোধী জোটের ভার্চুয়াল বৈঠকে মমতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাতে রাজ্যের কংগ্রেস নেতারা প্রমাদ গুনছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি আগের মতোই আবার রাজ্য কংগ্রেসকে তৃণমূলের হাতে ইজারা দেবে হাইকমান্ড? রাজ্য কংগ্রেস সভাপতির দৌড়ে এখনও প্রদীপ ভট্টাচার্যই এগিয়ে প্রদীপবাবুর ঘনিষ্ঠমহলের দাবি, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে, শুধু ঘোষণা বাকি।

প্রদীপবাবু বলেন, প্রদেশ সভাপতির নাম ঘোষণা হয়ে গেলেই সিপিএমের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু হবে। এ রাজ্যের নীচুতলায় আমাদের কর্মীরা বাম-কংগ্রেস জোট চান। কাজেই জোট নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। সিপিএমের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, হয়তো কোনও অসুবিধের জন্য কেরলের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিজেপি বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকের খবর পেঁছোয়নি বা তাঁর পক্ষে বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এ রাজ্যে বাম-কংগ্রেস জোটের ভবিষ্যতের কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা জোট গড়তে রাজি। বিধানসভার ভিতরে বাম-কংগ্রেস জোটের অন্যতম সেনাপতি আব্দুল মান্নানও। তিনি কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতির দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ায় প্রদেশস্তরের রাজনীতি থেকে আপাতত ক্ষোভের সঙ্গে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। দলের সঙ্গে তাঁর এই মানসিক দূরত্ব বাম-কংগ্রেস জোটের পক্ষে খুব একটা স্বাস্থ্যকর হবে না।

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিরোধী জোট টিকিয়ে রাখতে মমতার মতো লড়াকু নেত্রীকে সামনে রাখতে চাইবেই কংগ্রেস হাইকমান্ড। কিন্তু রাজ্যে বাম-কংগ্রেসের জোট থাকলে মমতা কতটা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সঙ্গে সহয়োগিতায় রাজি হবেন, সেটাও এখন বড় প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে বরাবরের মতো দিল্লির স্বার্থে কংগ্রেস হাইকমান্ড বাংলাকে আবার কুরবানি দিতে পারে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।

কংগ্রেসের সমস্যা হল, দলের একটা বড় অংশ মনে করে, সিপিএমের সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করা যায় না। বাম রাজত্বের দগদগে ঘা এখনও মানুষের মন থেকে সরে যায়নি। এই অবস্থায় কংগ্রেসের তৃণমূলস্তরের কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছেন। একদল সিপিএমের সঙ্গে লড়তে রাজি, আরেকটি বড় অংশ রাজি নন। এই অঙ্কে মনে করা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বাম-কংগ্রেস জোটে হাইকমান্ড সিলমোহর না দিলেও দুপক্ষেই জোটের প্রবক্তাদের অনুগামীরা তলে তলে জোট করবেন। অন্যদিকে, জোট হলেও গ্রামাঞ্চলের ভুক্তভোগী কংগ্রেস কর্মী সবাই তা মেনে নিতে নাও পারেন। ফলে বাম-কংগ্রেস জোটের সব ভোট এক বাক্সে পড়বে, এমন কথা হলফ করে বলা যাবে না।