ব্যক্তি উদ্যোগে নতুন রূপে সাজছে ওদলাবাড়ির শ্মশান

117

অনুপ সাহা, ওদলাবাড়ি : শ্মশান না পার্ক? শবদাহ করতে এসে মন ভালো হয়ে যেতে পারে শ্মশানের চেহারা দেখে। সবুজ ঘাসের আচ্ছাদন শ্মশান চত্বরে। এলেবেলে নয়, বাইরে থেকে আনা সুদৃশ্য ঘাস শ্মশানের চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। শ্মশানঘাট ও লাগোয়া মন্দির চত্বর মুড়ে ফেলা হয়েছে দামি মার্বেল পাথরে। শবদাহের জন্য দুটো চিতা তৈরি করা হয়েছে। রংবেরংয়ের ফুল ও ফলের গাছে সেজে উঠেছে শ্মশানটি। শ্মশানযাত্রীদের বিশ্রামের সুবন্দোবস্তও হয়েছে। না এই উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসন বা গ্রাম পঞ্চায়েতের নয়। সদিচ্ছা থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এমন পরিকল্পনা রূপায়ণ করা যেতে পারে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ওদলাবাড়ির শ্মশানঘাটটি। শিলিগুড়ির এক ব্যবসায়ীর একক উদ্যোগে চেল নদীর ধারে এই শ্মশানটির ভোল আমূল পালটে গিয়েছে। এগিয়ে এসেছে  মাড়োয়ারি সেবা সমিতিও। এই সংগঠনের  পক্ষ থেকে আগেই শ্মশানঘাটে রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
অথচ একটা সময় ছিল, যখন এই শ্মশানের নাম শুনলে এলাকার বাসিন্দারা আঁতকে উঠতেন। আবর্জনার স্তূপ, ছড়িয়ে থাকা মদের বোতলে নরকের চেহারা ছিল ওই শ্মশান চত্বরে। অবস্থা এতটা বেহাল ছিল যে, দিনমানে লোকজন যাওয়া তো দূরের কথা, কেউ মারা গেলে বাধ্য হয়ে মৃতের পরিবার ছাড়া শ্মশানে কেউ যেতে চাইতেন না। সেই সুযোগে দিনের আলোতেও শ্মশান চত্বরে দুষ্কৃতীরা মদের আসর বসাত। অসামাজিক কার্যকলাপের জায়গা হয়ে উঠেছিল শ্মশানঘাটটি। স্থানীয় প্রশাসনকে শ্মশানের এই বেহাল দশার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেলেও এই সমস্যার প্রতিকার করতে পদক্ষেপ করেনি। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন বিনয় (বিন্নি) কুমার চৌধুরী নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাও নন। থাকেন শিলিগুড়িতে। তবে ওই শ্মশানে তাঁর যাতায়াত ছিল। কালাবাবা নামে এক সাধু ওই শ্মশানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতে ওই শ্মশানে প্রায় নিয়মিত যেতেন বিন্নিবাবু। তাঁর কথায়, এলাকার পরিবেশ দেখে তখন ভীষণ খারাপ লাগত। সেসময়ই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে, ঘাটের এই পরিবেশ আমি পালটে দেবই। তিনি জানিয়েছেন, মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা করেই সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে।
বিনয়বাবুর এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। ওদলাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মধুমিতা ঘোষ বলেন, শ্মশানটির আমূল সংস্কারে বিনয়বাবুর এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে রয়েছে। শ্মশানঘাট ও মন্দির দুটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুরলী বাবা বলেন, বিনয়বাবু যা করেছেন, তাতে কোনও প্রশংসাই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। ওদলাবাড়ি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক তপন ঘোষ বলেন, বিনয়বাবুর কাজের প্রশংসা না করে পারছি না। তিনি শ্মশানের পুরো ছবিটাই পালটে দিয়েছেন। এভাবে সংস্কারের পর দুষ্কৃতীরা ইতিমধ্যে শ্মশান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে। প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ করে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনয়বাবু একাধিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছেন। তবু শ্মশানের আরও বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। স্থানীয় প্রশাসন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি শ্মশানে গোশালা, পুকুর, বাচ্চাদের খেলার জায়গা ও বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করবেন বলে ঠিক করেছেন। শ্মশান সাজানোর এই উদ্যোগকে তাঁর প্রয়াত বাবা অমৃতকুমার চৌধুরী ও মা প্রভা চৌধুরীকে উৎসর্গ করেছেন বিনয়বাবু।