রায়গঞ্জ মেডিকেলে রক্ত নিয়ে কালোবাজারি

101

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : প্রবল রক্তসংকটে ভুগছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। মেডিকেলের ব্লাড ব্যাংকে রক্তের ভাঁড়ার প্রায় শূন্য। সুয়োগ বুঝে সক্রিয় হয়ে উঠেছে রক্তের কারবারিরাও। হাসপাতাল ও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দ্রুত রক্তদান শিবিরের আয়োজন না হলে এই সংকট কাটার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে জীবনের শঙ্কা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন রোগী ও তাঁদের আত্মীয়স্বজনরা।

শনিবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, রোগীর পরিবারের লোকজন রক্তের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। হেমতাবাদের বাহারাইলের বাসিন্দা সহদেব রায় বলেন, আমার বউদি নন্দিতা রায় প্রসববেদনা নিয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেলে ভরতি হয়েছেন। এ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন। রক্ত না থাকায় বাধ্য হয়ে রক্ত দিয়ে রক্ত নিতে হল। ইটাহার থানার হাঁসুয়ার বাসিন্দা পার্থ বর্মন বলেন, আমার বউদি অপরাজিতা বর্মন হাসপাতালে ভরতি। চিকিৎসকের বক্তব্য, তিন পাউচ রক্তের প্রয়োজন। তা না হলে তাঁর অপারেশন হবে না। বাধ্য হয়ে গ্রাম থেকে তিনজনকে নিয়ে এসে রক্ত দিয়ে রক্ত নিতে হল। একই কথা রায়গঞ্জ শহরের তুলসীপাড়ার বাসিন্দা মুকুল মণ্ডলের। রায়গঞ্জ থানার বরুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রায়পুরের বাসিন্দা প্রকাশ সাহা বলেন, আমার স্ত্রী রিমা সাহা প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছে। সিজার হবে। রক্তের প্রয়োজন। ব্লাড ব্যাংকে এসে দেখি রক্ত নেই। গ্রাম থেকে লোক নিয়ে এসে তিন ঘণ্টা বাদে রক্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত না পেয়ে অনেকে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। সেই ছবিও ধরা পড়ছে প্রতিদিন। মেডিকেলের তরফে জানানো হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলি রক্তদান শিবির না করলে রক্তের সংকট চরম আকারে পৌঁছোবে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রবীন্দ্রনাথ প্রধান বলেন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলি রক্তদান শিবিরের আয়োজন করলে রক্তের সংকট মেটানো সম্ভব। রায়গঞ্জ নাগরিক কমিটির সম্পাদক তপন চৌধুরি বলেন, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে রক্তের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এই ফাঁকে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে থাকা দালালরা রক্ত বিক্রি করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত, ব্লাড ব্যাংকের সামনে পুলিশি পাহারার পাশাপাশি দালালদের চিহ্নিত করা।

রক্তের ভাঁড়ার কার্যত শূন্য রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। এদিন রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের ব্লাড ব্যাংকের বোর্ডে লিখে দেওয়া হয়, সব মিলিয়ে মোট ১০ ইউনিট রক্ত রয়েছে। এর মধ্যে এ পজিটিভ এক ইউনিট, বি পজিটিভ দুই ইউনিট, ও নেগেটিভ তিন ইউনিট, এবি পজিটিভ এক ইউনিট, বি নেগেটিভ এক ইউনিট, এবি নেগেটিভ দুই ইউনিট। ও পজিটিভ এবং এ নেগেটিভ গ্রুপের কোনো রক্ত নেই। এই বোর্ড দেখে এদিন রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন রোগী ও রোগীর পরিজনরা। অপারেশন টেবলে তোলার আগে চিকিৎসকের নির্দেশমতো রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে কালঘাম ছুটছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজে ভরতি থাকা রোগীর পরিজনদের। মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত জোগাড় করতে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের। এদিকে সুয়োগ বুঝে মেডিকেল ক্যাম্পাসেই চলছে রক্তের কালোবাজারি। ডোনারের নাম করে অনেকেই রক্ত বিক্রি করছে এক থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। ব্লাড ব্যাংকের আশপাশে ঘুরছে সেইসব দালালরা। যে গ্রুপের রক্তের বেশি চাহিদা তার দাম চড়া। বাধ্য হয়ে মোটা টাকা দিয়ে দালালদের কাছ থেকে রক্ত কিনছেন রোগীর পরিবার পরিজনরা।

এমনটাই অভিযোগ করলেন রায়গঞ্জের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার সুব্রত সরকার। তাঁর বক্তব্য, ব্লাড ব্যাংকের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে দালালরা। রোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাচ্ছি। আমরা প্রচার করছি রক্ত দিতে কোনো টাকা লাগে না। যদিও ব্লাড ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, রোগীর পরিবারের লোকজন নিজেদের আত্মীয়ে কথা বলে ডোনার নিয়ে এসে রক্ত দিচ্ছে। আমরা রোগীর পরিবারের লোকজনকে এনিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করছি। তবে রক্ত দিয়ে কোনো ডোনার যদি হাসপাতালের বাইরে গিয়ে রোগীর পরিবারের কাছ থেকে টাকা চায়, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ সুরজিৎকুমার মুখার্জি বলেন, রক্তের সংকট চলছে। রক্তের সংকট মেটানোর জন্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। রক্ত বিক্রির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতাল ক্যাম্পাসে রক্ত বিক্রির কোনো ঘটনা নেই। ক্যাম্পাসের বাইরে কেউ রক্ত বিক্রি করলে আমাদের কিছু করার নেই। তবে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে অভিযুক্তর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।