শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার : চিকিৎসকের অভাবে কোচবিহার জেলার অর্ধেকেরও বেশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্তর্বিভাগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বহির্বিভাগের পরিসেবা দিতেও রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছে। কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছেন একজন মাত্র চিকিৎসক। আবার কোথাও রোগী দেখছেন ফার্মাসিস্ট ও নার্সরা। একের পর এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্তর্বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ এলাকার স্বাস্থ্য পরিসেবা ভেঙে পড়েছে। তবে শুধু প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিই নয়, জেলার প্রায় প্রত্যেকটি হাসপাতালেই রয়েছে চিকিৎসকের অভাব। তাই জেলায় মেডিকেল কলেজ, মাতৃমা তৈরি করে অত্যাধুনিক পরিসেবা দেওয়ার চেষ্টা চললেও সামগ্রিক পরিসেবার মান তলানিতে ঠেকেছে বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুমিত গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, চিকিৎসক ও কর্মীর অভাবের জন্য কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্তর্বিভাগ বন্ধ হয়েছে। চিকিৎসক নিয়োগ হলেই সমস্যা মিটে যাবে।

জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, কোচবিহার জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ, চারটি মহকুমা হাসপাতাল, ১০টি গ্রামীণ হাসপাতাল, একটি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২৯টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাতটি দাতব্য চিকিৎসালয়, একটি মানসিক হাসপাতাল ও ৪০৬টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে (তার মধ্যে ২২টিকে সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করা হচ্ছে)। কোচবিহার সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বাদ দিয়ে জেলার বাকি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলির জন্য ১৩১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ১৭১ জন চিকিৎসক, ৪৫ জন আয়ুষ বিভাগের চিকিৎসক থাকার কথা। কোচবিহার সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন ১৭০ জন। একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, কোচবিহার জেলায় ৪০ শতাংশের বেশি চিকিৎসকের পদ ফাঁকা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ পদ ফাঁকা থাকায় পরিসেবার মান তলানিতে ঠেকেছে। জেলার ২৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ১৪টিতে অন্তর্বিভাগ থাকার কথা। কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে বন্ধ হতে হতে এখন মাত্র ছয়টিতে অন্তর্বিভাগ খোলা রয়েছে। সেগুলিতেও নিয়মিত পরিসেবা দিতে স্বাস্থ্য দপ্তরের হিমসিম খেতে হচ্ছে।

- Advertisement -

কোচবিহার-১ ব্লকের পুঁটিমারি ফুলেশ্বরী, কোচবিহার-২ ব্লকের গোপালপুর, তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের দেওচড়াই, মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের খেতি ফুলবাড়ি, দিনহাটা-২ ব্লকের নয়ারহাট, শীতলকুচি ব্লকের ছোট শালবাড়ি ও সিতাই ব্লকের নাকারজান স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হলদিবাড়ির হুদুমডাঙ্গা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্তর্বিভাগ বন্ধ রয়েছে। সেগুলির বহির্বিভাগ চালু থাকলেও চিকিৎসকের অভাবে ধুঁকছে। হলদিবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে সাতজন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সেখানে রয়েছেন মাত্র তিনজন চিকিৎসক। হুদুমডাঙ্গা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন চিকিৎসক রয়েছেন। ফলে তিনি ছুটিতে থাকলে ব্যাপক সমস্যা হয়। বালাভূত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তিনজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও সেখানে একজনও নেই। ফলে ফার্মাসিস্ট রোগী দেখছেন। দেওচড়াই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন চিকিৎসক রয়েছেন। কিন্তু সেখানে থাকার কথা তিনজন। চিকিৎসকের অভাবে এখানে দীর্ঘদিন অন্তর্বিভাগ বন্ধ রয়েছে। তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসকের ৩২টি পদ থাকলেও সেখানে রয়েছেন ২৩ জন। এদিকে বক্সিরহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঁচজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও তিনজন রয়েছেন। দেওয়ানহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চারজন চিকিৎসক রয়েছেন। সেখানে থাকার কথা ছয়জন।

এদিকে মেখলিগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে ৩২ জন থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ১৭ জন। পুণ্ডিবাড়ি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাত্র দুইজন চিকিৎসক রয়েছেন, যেখানে থাকার কথা পাঁচজন। চান্দামারি গ্রাম পঞ্চায়েছের পুঁটিমারি ফুলেশ্বরী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন স্থায়ী চিকিৎসক নেই। ফলে ইনডোর পরিসেবা চালু করা যায়নি। অপর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক সপ্তাহে তিনদিন বহির্বিভাগের দাযিত্ব সামলাচ্ছেন। দিনহাটা-১ ও ২ এবং সিতাই ব্লকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পাঁচজন করে চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও প্রত্যেকটিতেই দুজন করে রয়েছেন। দিনহাটা মহকুমার বামনহাটের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক রয়েছেন। কিশামত দশগ্রাম ও নাজিরহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছেন একজন করে। চিকিৎসক শূন্য রয়েছে থরাইখানা ও নয়ারহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। দিঘলটারি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রেও চিকিৎসক নেই। চিকিৎসক না থাকায় সেখানে নার্স ও ফার্মাসিস্ট দিয়ে পরিসেবা চলছে। হলদিবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে সাতজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও তিনজন রয়েছেন।

মেডিকেল কলেজ বা মহকুমা হাসপাতালগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই রোগীর চাপ অনেক বেশি। তাই ভিড় এড়াতে নিজের এলাকার গ্রামীণ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির উপরই নির্ভর করেন বহু মানুষ। কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে অধিকাংশ সময়ই মহকুমা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজে ছুটতে হচ্ছে তাঁদের। নিয়ম অনুয়ায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রেগুলিতে সপ্তাহে ছয়দিন বহির্বিভাগ খোলা রাখার কথা থাকলে তা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে একজন চিকিৎসক সেখানে সেই চিকিৎসক ছুটিতে থাকলে সমস্যা বেড়ে যায়। শুধু কোচবিহার জেলাই নয়। গোটা রাজ্যজুড়েই চলছে চিকিৎসকের সংকট। সংকট মেটাতে কোচবিহার জেলাতেও মেডিকেল কলেজে পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। তবে কবে মিটবে চিকিৎসকের অভাব? এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।