স্বাধীনতার সাত দশক পরেও কুলিক পেরোতে নৌকা ভরসা

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ : স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরেও রায়গঞ্জ শহর লাগোয়া গ্রামগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। অথচ উত্তর দিনাজপুর জেলার বেশিরভাগ জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ অতি সহজে এবং দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছেন নিজেদের গন্তব্যস্থলে। কিন্তু রায়গঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। শহর লাগোয়া গ্রামগুলির এখনও ভরসা খেয়া নৌকা। নদী পারাপারে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় এলাকাবাসীকে। স্থানীয় বাসিন্দারা নদীর ওপর কংক্রিটের সেতুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই দাবিপূরণ না হওয়ায় আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।

রায়গঞ্জ শহরের গা ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে কুলিক নদী। নদীর ওপারে রয়েছে রায়গঞ্জ ব্লকের মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক গ্রাম। কয়েক হাজার মানুষ বাস করেন গ্রামগুলিতে। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে রায়গঞ্জ শহরে আসতে হয় বাসিন্দাদের। নদীর এপারে রয়েছে রায়গঞ্জ পুরসভার ১৬, ১৭, ২২ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড। নদীর পূর্বদিকে রয়েছে রায়গঞ্জ শহর। সেখানে ঝাঁ চকচকে আলো ঝলমলে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে নদীর ওপর কংক্রিটের সেতু না থাকায় সারা বছর গ্রামবাসীদের ভরসা করতে হয় নৌকার ওপর।

- Advertisement -

মাড়াইকুরা গ্রাম পঞ্চায়েতের কাটাবাড়ি, নুসরতপুর কাটাবাড়ি, ভরিয়া, বাসুদেবপুর, ভাতগড়া, ভিটি কাটিহার, এলেঙ্গিয়া, ঘোষপাড়া গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ব্যবসাবাণিজ্য তথা পড়াশোনার জন্য রায়গঞ্জ শহরের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন তারা ভোরবেলা শাকসবজি, দুধ, দই, মাটির জিনিস নিয়ে রায়গঞ্জ শহরে যান। ছাত্রছাত্রীদের স্কুল, কলেজ ও প্রাইভেট টিউশন পড়তে শহরে যেতে হয়। সকাল ছয়টা থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত খেয়া পারাপার করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌকার মাঝিরা। একসঙ্গে বেশ কয়েকজন যাত্রী না থাকলে নৌকা নিয়ে ওপার থেকে এপারে আসতে চান না মাঝি। ফলে একদিকে অসুস্থ রোগীরা, অন্যদিকে কোনও জরুরি কাজ নিয়ে কেউ শহরে আসার থাকলে বিপদে পড়েন। অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের তিন কিমি ঘুরে শহরে আসতে হয়।

স্থানীয় এক ছাত্র রোহিত দাস এদিন জানায়, এখানে খেয়া পারাপার বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে দেখে আসছি। বর্ষার সময় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও, অন্য সময়ে এই খেয়া পারাপার চলতে থাকে। সোলা পাসোয়ান নামে এক মাঝি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাটে নৌকা পারাপার করি। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ৫ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। মোটর সাইকেল থাকলে ভাড়া ১০ টাকা দিতে হয়। তবে লকডাউনের পর থেকে নৌকা পারাপারের লোক কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। কাটাবাড়ির বাসিন্দা লাল মহম্মদ জানান, সুভাষগঞ্জ সেতু হয়ে যাতায়াত করলে অনেক ঘুরে শহরে আসতে হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে রায়গঞ্জ শহরে পৌঁছাতে আমাদের নৌকা পারাপারের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। এই ঘাটে ছোট সেতু নির্মাণ হলে যাতায়াতে সমস্যা অনেকটাই পূরণ হবে।

রায়গঞ্জ পুরসভার নদীপারের বাসিন্দা অপর্ণা সাহা রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ি দুটো ভিন্ন প্রান্তে হওয়ায় প্রায়ই টাকা দিয়ে নৌকা পারাপার করতে হয়। এখানে সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। আমরা এজন্য আন্দোলনও করেছি। কিন্তু কিছু হয়নি। গ্রামবাসীরা আন্দোলনে নামলে আমরা থাকব। ওপারের ঘোষপাড়ার বাসিন্দা লিটন ঘোষ জানান, খেয়াতরি ঘাটে সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেয় অনেকে। তারপর সব চুপ। এবার লিখিত প্রতিশ্রুতি না দিলে আন্দোলনে নামব।

১০ নম্বর মাড়াইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কমল দেবশর্মা বলেন, এখানে একটি সেতু হলে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের সমস্যা দূর হবে। তবে গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষে সেতু তৈরি করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের সঙ্গে কথা বলব। রায়গঞ্জের পুরপ্রধান সন্দীপ বিশ্বাস বলেন, আমরা পুরসভার তরফে ওইখানে ঘাট তৈরি করে দিয়েছি। ঘাটের রাস্তা সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিয়েছি। বাকি দায়িত্ব আমাদের নয়। পুরসভার পক্ষে যতটা করা সম্ভব, আমরা ততটাই করেছি। সেতুর ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।