নিউজ ব্যুরো, ১২ মে : রাজনৈতিক দলগুলো এতদিন টাকা তোলার জন্য অনেক কৌশল নিয়েছে। তোলাবাজির যুগ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত বামপন্থীরা প্রধানত পথে নেমে কৌটো ঝাঁকিয়ে লাল শালু পেতে অথবা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে টাকা তুলতেন। এখনও বিমান বসুর মতো কোনো কোনো নেতা এই পথে রয়েছেন। এখন কানহাইয়া কুমার প্রচারের খরচ তোলার যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন তাতে ভবিষ্যতে আর কাউকে পথে নেমে কৌটো ঝাঁকাতে হবে না। ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মের উপর ভরসা করে তাঁর প্রচারের জন্য ৭০ লক্ষ টাকা উঠে গিয়েছে। তাই সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের পুরো পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিতে পেরেছেন।

তবে এই টাকা তোলার ব্যাপারে কানহাইয়া কুমারের যে খুব বেশি কৃতিত্ব আছে, সেকথা বলা যাবে না। এর পিছনে এমন একজন রয়েছেন যিনি আমেরিকায় গিয়ে বারনি স্যান্ডর্সের প্রচার কৌশল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বারনি একদিনে ৮ মিলিয়ন ডলার তুলে ফেলেছিলেন। সেই অঙ্ক বিলাল জাইদিকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। তিনি বারনির প্রচারের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে কথা বললেন এবং দেখলেন, সেদেশের সাধারণ নাগরিকরাও ৫ ডলার করে চাঁদা দিচ্ছেন।

ব্যাস, বিলাল জাইদির মাথায চাঁদা তোলার এমন কৌশল ঢুকে গেল, আজকাল ইংরেজিতে যাকে বলা হয ক্রাউডফান্ডিং। দেশে ফিরলেন বিলাল। বন্ধু আনন্দ মাংনেলকে সঙ্গে নিয়ে খুলে ফেললেন ক্রাউড নিউজিং, স্বাধীন সাংবাদিকতায় অর্থ বিনিয়োগের এক নতুন প্ল্যাটফর্ম। এবার লোকসভা ভোটের আগে জানুয়ারি মাসে বিলাল ও আনন্দ তৈরি করলেন আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসি। এখন ওই সংস্থা ৮০টি প্রচারের সঙ্গে যুক্ত। বিলালদের ক্লায়েন্টদের তালিকায় যেমন কৃষক ও দলিত নেতা-কর্মী রয়েছেন, তেমনই রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সংগঠনও।

ক্রাউড নিউজিং-এর মাধ্যমে গুজরাটের দলিত নেতা জিগ্নেশ মেওয়ানির হয়ে ২০ লক্ষ টাকা তোলার পর আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসির ধারণা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন বিলাল ও আনন্দ। মেওয়ানির প্রচারের স্লোগানও ছিল জনতা কি লড়াই, জনতা কে পয়সে পে। অর্থাৎ, জনতার পয়সায় জনতার লড়াই। আনন্দ এর আগে ইরম শর্মিলার মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর যুক্তি, যাঁরা ক্রাউডফান্ডিং বা জনতার পযসায় লড়ছেন, তাঁদের জনতার স্বার্থে কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। তখন আর স্থানীয় বিল্ডার বা ব্যবসায়ীর স্বার্থ দেখার উপায় থাকে না।

এবার কানহাইয়া কুমারের পাশাপাশি দিল্লিতে আপ প্রার্থী অতিশি মারলেনার জন্যও ৭০ লক্ষ টাকা তুলে ফেলেছে আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসি, দিল্লি সরকারের আধুনিক শিক্ষানীতির জন্য যিনি ইতিমধ্যেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। তবে অনেক কম প্রভাবশালী এবং অজানা প্রার্থীর হয়ে টাকা তুলছে আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসি। তাঁদের বাজেট ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। যেমন মহারাষ্ট্রের বৈশালী ইয়েড়ে। যেসব কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন, বৈশালীর স্বামীও রয়েছেন তাঁদের মধ্যে। তিনি ভোটে লড়ছেন কৃষকদের দুর্দশা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে।

তেমনই স্নেহা কালে লড়ছেন মুম্বইতে রূপান্তরকামীদের অধিকার রক্ষায়। আর অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয় কুমার লড়ছেন তাঁর বন্ধু রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর ঘটনার বিচার চেয়ে। অর্থাৎ, আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসি যাঁদের প্রচারের সঙ্গে জুড়েছে তাঁদের সকলেই যে ভোটে জেতার জন্য লড়ছেন, তা নয়। অনেকেই লড়ছেন অধিকার রক্ষার আন্দোলনে অন্যদের উৎসাহিত করতে। আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসির মুম্বইয়ের পরামর্শদাতা যশ মারোয়া যেমন বলছেন, যিনি চাঁদা দিচ্ছেন, তিনি আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চান না। তাঁরা তাঁদের দাবি এবং অধিকারের কথা জোরগলায় বলতে চান।

তবে বিলাল জাইদি মনে করেন ভারতীয়রা এখনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তুলনায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় দান করতেই আগ্রহী। তাঁর মতে, কোন কোন ঘটনা গণতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন কেন তাঁরা অতিশির মতো সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদের জন্য চাঁদা দেবেন? বিলাল সোশ্যাল মিডিয়ায় এইসব প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন কীভাবে ছোটো ছোটো অঙ্কের চাঁদা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

বিলালদের এতদিনের পরিশ্রম এখন কাজে লাগতে শুরু করেছে। প্রতিটি ক্লায়েন্টর কাছ থেকে তাঁরা ৫ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে থাকেন। এইভাবেই আওয়ার ডেমোক্র‌্যাসি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও তাঁদের মনে হয় যাঁরা বিনিযোগ করেন তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আশঙ্কা রয়েছে। বিলালদের পরবর্তী লক্ষ্য মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচন। সেখানে তাঁরা শতাধিক প্রার্থীর জন্য অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্র নিয়েছেন। প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগে বিলাল মনে করেন অন্য সব ক্ষেত্র যেমন আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, রাজনৈতিক জগতেরও তেমনটি করা উচিত। তাঁর কথায়, এমন দিন আসতে চলেছে যখন রাজনীতি চলবে ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।