ড্রাগন ফ্রুটের চাষ এবং তার পরিচর্যা

সাম্প্রতিককালে নতুন চাষযোগ্য ফলের মধ্যে সর্বাধুনিক সংয়োজন হল ড্রাগন ফ্রুট বা পিটায়া। যা মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্সের ফল। এটা এক ধরনের ক্যাকটাস বা সাকুলেন্ট গোত্রের গাছ, যা লতার মতো বাড়তে থাকে। এই ফল মূলত ড্রাগন ফ্রুট হিসেবে পরিচিত। চিনারা এটিকে ফায়ার ড্রাগন ফ্রুট এবং ড্রাগন পার্ল ফ্রুট বলে, ভিয়েতনামে সুইট ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফ্রুট, থাইল্যান্ডে ড্রাগন ক্রিস্টাল নামে ফলটি পরিচিত। এছাড়া অন্যান্য দেশে স্ট্রবেরি, নাশপাতি বা নানেট্টিকাফ্রুটও বলা হয় একে। উত্তরবঙ্গের অনেক চাষি এই ফলটির চাষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত হননি এখনও। তাই এই অত্যাধুনিক ও মহামূল্যবান ফলটির চাষ, পরিচর্যা ও সার্বিক বিষয় জানতে মালদা কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহ কৃষি অধিকর্তা (প্রশিক্ষণ) ডঃ কৌশিক নাগের মুখোমুখি হয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ সংবাদের প্রতিনিধি কৌস্তুভ দে সরকার

প্রশ্ন : ড্রাগন ফল দেখতে কেমন?

- Advertisement -

উত্তর : ড্রাগন ফলের রংটি আকর্ষণীয়। আগুন-লাল রঙা ফলের বাইরে কিছু ভাঁজের মতো থাকে। মাঝামাঝি কাটলে চামচ দিয়ে ভিতরের শাঁস তুলে খাওয়া যায়।

প্রশ্ন : সবাই বলে, এই ফলটি নাকি খুব উপকারী, কিন্তু কেন?

উত্তর : প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলের প্রায় ৫৫ গ্রামই খাওয়ার যোগ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফল থেকে আমরা পাই ৮০ থেকে ৯০ গ্রাম জল, প্রোটিন-০.১৫ থেকে ০.৫ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৯ থেকে ১৪ গ্রাম, চর্বি ০.১ থেকে ০.৬ গ্রাম, আঁশ ০.৩ থেকে ০.৯ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৬ থেকে ১০ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.৩ থেকে ০.৭ গ্রাম, ফসফরাস ১৬ থেকে ৩৬ মিলিগ্রাম, নায়াসিন ০.২ থেকে ০.৪৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম। এতে ক্যালোরি খুব কম থাকে। তাই হৃদরোগীরাও খেতে পারেন। ভিটামিন সি বেশি থাকার ফলে এই ফল খেলে আমাদের শরীরের ভিটামিন সি-এর চাহিদা পূরণ হয়। লাল শাঁসের ড্রাগন ফল থেকে বেশি পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। আয়রন থাকার কারণে এই ফল খেলে রক্ত শূন্যতা দূর হয়। নিয়মিত ড্রাগন ফল খেলে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই এই ফল ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য অতি উত্তম। ড্রাগন ফলের শাঁস পিচ্ছিল হওয়ায় এই ফল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে জল থাকার কারণে এই ফল জুস আকারে খেলে শরীরে জলের ঘাটতি বা অভাব সহজেই দূর হয়।

প্রশ্ন : ড্রাগনের চারা কীভাবে করা হয়?

উত্তর : শাঁসে কালো বীজ থাকে যা থেকে চারা করা যায়। শাঁসে যে কালো বীজ থাকে তা আলাদা করে অন্য ফলের মতো মাটি মিশ্রণে বসিয়ে কালো পলিপ্যাকে ভরতে হয়। দুই সপ্তাহ পরে অঙ্কুর ও ২ মাস পরে চারা বেরোয়। চারা থেকে ক্যাকটাস বাড়তে ও নতুন লাগাতে পরিশ্রম আছে এবং তা সময়সাপেক্ষও।

প্রশ্ন : এর চারা কোথায় পাওয়া যাবে?

উত্তর : এখন বিভিন্ন নার্সারিতে এই ফলের চারা পাওয়া যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নার্সারিতে এই চারা এখন পাওয়া যায়। অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও এখন এর চারা তৈরি করছেন। যেমন, বুলবুলচন্ডীতে নীলকান্ত সাহা, চাকুলিয়াতে পবিত্র রায়, উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শিলিগুড়িতে বিভিন্ন নার্সারি রয়েছে, কোচবিহার জেলায় সাত মাইল সতীশ ক্লাব এবং উত্তরবঙ্গের ফার্মার্স ক্লাবগুলোও ড্রাগন ফলের চারা তৈরি করছে।

প্রশ্ন : এর চারা বসানোর কোনও নিয়ম আছে ?

উত্তর : যেহেতু এটি ক্যাকটাস বা সাকুলেন্ট গোত্রের তাই ফুট খানেক গর্তে ১০ কেজি গোবর বা কেঁচো সার, এক মুঠো হাড় গুঁড়ো ও ৫ গ্রাম দানা বিষ দিয়ে মাটি উঁচু করতে হবে। ফুট দশেকের দূরত্বে চারা বসাতে হবে। দেখতে হবে সারির দূরত্ব যেন ১২-১৩ ফুট হয়। গাছগুলি বড় হলে বাঁশ বা সিমেন্ট পোল দিয়ে ঠেকনা দিতে হবে। এ বার সেইগুলোর উপর দিয়ে গাছ বাইয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে ডাল ছেঁটে গাছকে আয়ত্তে রেখে ঝোপের আকারে গড়ে তুলতে হবে।

প্রশ্ন : ড্রাগন চাষের আবহাওয়া ও মাটি কিরকম হওয়া দরকার?

উত্তর : আমাদের রাজ্যের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়াতে ও কিছুটা রাঢ় অঞ্চলের দিকে ড্রাগন ফলের চাষ ভালো হবে। তবে অন্যান্য জেলাতেও এটি করা সম্ভব হবে। খুব অল্প ক্ষার মাটি ছাড়া সব মাটিতেই হবে। তবে, আর্দ্রতা বেশি থাকলে রোগপোকার আক্রমণ হতে পারে। আর জল যেন একদমই না জমে।

প্রশ্ন : ড্রাগন ফলের চাষ কি বাড়ির ছাদেও করা সম্ভব?

উত্তর : হ্যাঁ, যে সমস্ত মানুষের চাষের কোনও জায়গা নেই, তাঁরা বাড়ির ছাদেও এর চাষ করতে পারেন। একটি বড় মাটির চারি বা সিমেন্টের চারিতে একটি গাছের জন্য যে পরিমাণ সার প্রয়োজন, যেমন ২ কেজি গোবর বা কেঁচো সার, ২৫ গ্রাম ইউরিয়া, ৭৫ গ্রাম ১৫:১৫:১৫ সার ভালোভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে এই গাছের চারা পুঁতলে ছাদে যেখানে রোদ আলো রয়েছে সেখানে এর চাষ করা সম্ভব। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে না হলেও বাড়ির সদস্যদের নিজেদের খাওয়ার জন্যও এই ফল বাড়িতেও চাষ করা যেতে পারে।

প্রশ্ন : ড্রাগন ফল কি মহিলারা চাষ করতে পারবে?

উত্তর : ড্রাগন ফল মহিলারাও চাষ করতে পারবে। বাড়ির উঠোনে বা কিচেন গার্ডেন অর্থাৎ সবজি বাগানে ড্রাগন ফলের চারা লাগিয়ে পাশে শুধু একটা সাপোর্ট হিসেবে সিমেন্টের রড বা লোহার খুঁটি বা বাঁশের খুঁটি পাশে রাখতে হবে। এই কাজটা মহিলারাও করতে পারবেন। এটি ক্যাকটাস জাতীয় গাছ বলে এর সেরকম কোনও পরিচর্যা করতে হয় না। শুধু পরিমাণ মতো সার এবং রোগপোকা লাগলে তার প্রতিষেধক দিতে হবে। দুবছরের মধ্যেই মোটামুটিভাবে ফল তাঁরা পেয়ে যাবেন।

প্রশ্ন : ড্রাগন ফলের চাষ কি অর্গানিক মানে জৈবভাবে করা সম্ভব?

উত্তর : নিশ্চয়ই সম্ভব। গাছ পিছু চার কেজি পচানো জৈব সার বা গোবর সার দেওয়া যায়। গাছের পাতায় দাগ হলে সেক্ষেত্রেও জৈব ছত্রাক বা ব্যাক্টেরিয়া নাশক এবং এক লিটার জলে ৩ মিলিলিটার নিমতেল মিশিয়ে স্প্রে করা যাবে। এভাবে কোনও রাসায়নিক সার বা বিষ প্রয়োগ না করেই এই ফলটি চাষ করে আমরা খেতে পারি।

প্রশ্ন : এর পরিচর্যা কীভাবে করা হয়?

উত্তর : পরিচর্যা খুবই সহজ ব্যাপার। সাধারণত পোক্ত খুঁটি বা আঙুরের মতো ট্রেলিস করে এর ডাল, লতা বাইয়ে দেওয়া হয়। যা বছর কুড়ির মতো থাকে। ডালে লাল লাল ডিম্বাকার ফল হয়।

প্রশ্ন : ফল কখন পাওয়া যায়?

উত্তর : ২৬ মাস পর থেকে গাছে ফল আসবে। এর পর প্রতি বছর বর্ষায় ফল সংগ্রহ করতে হবে। একটি তিন বছরের বাগান থেকে বিঘায় সাত কুইন্টালের মতো ফলন মেলে।

প্রশ্ন : ড্রাগন ফলের কত রকম জাত রয়েছে?

উত্তর : সাদা, হলুদ ও লাল এই তিন রকম শাঁসযুক্ত ড্রাগন ফল দেখতে পাওয়া যায়। তবে লাল শাঁসের চাষই আমাদের এখানে যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।

প্রশ্ন : গাছের গোড়ায় কি কোনও সার প্রয়োগ করা যায়?

উত্তর : প্রতি গাছের পাশে রিং করে ২ কেজি গোবর/কেঁচো সার, ২৫ গ্রাম ইউরিয়া, ৭৫ গ্রাম ১৫:১৫:১৫ ফেওয়ার সুপারিশ আছে।

প্রশ্ন : রোগপোকা নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যাপার আছে কি?

উত্তর : পাতায় দাগ ছাড়া রোগপোকা খুব একটা নেই বললেই চলে। পাতায় দাগ বা ধসার জন্য কপার অক্সিক্লোরাইড ৪ গ্রাম/লিটার জলে স্প্রে করতে হবে।

প্রশ্ন : ড্রাগন ফলের চাষ কি উত্তরবঙ্গে শুরু হয়েছে?

উত্তর : প্রচুর ফাইবারযুক্ত এই ফলটি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ব্লক যেমন করণদিঘি, হেমতাবাদ, গোয়ালপোখর-২ প্রভৃতি বিভিন্ন ব্লকে যাঁরা এগিয়ে থাকা কৃষক মানে প্রোগ্রেসিভ ফার্মার, তাঁরা অল্প অল্প করে এই ফলের চাষ করছেন। কারণ, অন্য ফল যেমন আম জাম, কাঁঠাল এসবের তুলনায় আগামীদিনে এই ফলের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। কারণ মানুষ এখন স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গিয়েছেন। আর এই ফলে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে যেটা ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

প্রশ্ন : উত্তরবঙ্গে এই ফল কি কোথাও কিনতে পাওয়া যায়?

উত্তর : উত্তরবঙ্গের মধ্যে একমাত্র শিলিগুড়িতে বিগবাজার বা সিটি সেন্টারেই পাওয়া সম্ভব বলে মনে করা হলেও এখন কিন্তু প্রায় অধিকাংশ শহরের প্রতিষ্ঠিত ফলের দোকানেই এই ফল বিক্রি হচ্ছে। তবে হয়তো সেদিন আর দেরি নেই যখন বিভিন্ন গ্রামের হাট বা বাজার থেকেও এই দরকারি ফলটি কিনতে পাওয়া যাবে এবং গ্রামগুলি থেকে প্রায় সবখানে ড্রাগন ফল সরবরাহ করা যাবে।