ঠ্যালা চালিয়ে অ্যাথলিট গড়তে বুঁদ কোচবিহারের ‘ক্ষিদদা’

497

কোচবিহার :  ইনি যেন কোনি গল্পের সেই ক্ষিদদা। কোচবিহারের রাজবাড়ির পিছনে লিচুতলার মাঠে গেলেই দেখা মিলবে তাঁর। সংসারের জোয়াল টানতে রোজ ঠ্যালা ঠেলতে হয় তাঁকে। তবু তারই ফাঁকে বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার নেশায় মেতেছেন কোচবিহারের ফিরদৌস আলি। একসময় সবুজ ঘাস হাতছানি দিয়ে ডাকত তাঁকে। অভাবকে নিত্যসঙ্গী করেও আন্তর্জাতিক, জাতীয় সহ স্থানীয়স্তরের বহু ট্রফি, পদক, শংসাপত্র পেয়েছেন তিনি। সেসব থরে থরে ঘরে সাজিয়ে রেখেছেন ক্রীড়াজগতে মুন্সি নামে পরিচিত ফিরদৌস। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে থেকে প্রতিকূলতা পেরিয়ে খেলাধুলো চালিয়ে যাওয়া কতটা যে কষ্টকর, তা ভালোভাবেই জানেন বছর চল্লিশের ফিরদৌস। তাই অর্থাভাবে যাতে কারও খেলাধুলোর প্রশিক্ষণে সমস্যা না হয়, সেইজন্য নিজেই খুলে ফেলেছেন কোচিং সেন্টার। রাজবাড়ির পিছনে লিচুতলার মাঠে বিনা পারিশ্রমিকে দৌড়, শটপাট, ডিসকাসের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। এমনকি বাড়তি কাজ করে সেই পয়সায় ছাত্রদের জন্য ক্রীড়া সরঞ্জামও কিনেছেন মুন্সি।

কোচবিহার শহর সংলগ্ন টাকাগাছ-রাজারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের দর্জিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফিরদৌস আলি। স্ত্রী, দুই পুত্রকে নিয়ে তাঁর সংসার। ছোটবেলায় অর্থাভাবে পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এই ক্রীড়াবিদ। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে হাতের আঙুল ভেঙে যায়। এরপর দীর্ঘদিন খেলাধুলোর জগৎ থেকে দূরেই ছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে শুরু করেন দৌড়োনো। রোড রেস সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু করেন ফিরদৌস। অল্পদিনের মধ্যেই একের পর এক সাফল্য আসতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, অসম, দিল্লি, বাংলাদেশে অ্যাথলেটিক মিটে অংশ নিয়ে পদক ছিনিয়ে এনেছেন ফিরদৌস। দর্জিপাড়ায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, ছোট্ট ঘরে ঠাসা রয়েছে ট্রফি আর শংসাপত্র। মোট ৯৬টি ট্রফি ও ৬০টি পদক রয়েছে ফিরদৌসের। তার মধ্যে ছটি সোনার পদক। এতগুলি পদক তাঁর ঝুলিতে এলেও বড় কোনও কোচিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিতে পারেননি তিনি। ফিরদৌসের সে অর্থে ছিল না কোনও কোচও। স্রেফ জেদ আর অধ্যবসায়কে সম্বল করেই এতগুলি ট্রফি জিতেছেন তিনি। উপযুক্ত কোচিং পেলে তাঁর সাফল্যের মুকুটে আরও অনেক পালক শোভা পেতে পারত। ঝুলি ভর্তি সাফল্য থাকলেও কোচিংয়ের এই বিষয়টি ফিরদৌস ভালোমতোই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই দৌড় থামানোর পর কোচিংয়ে দিকে ঝোঁকেন তিনি।

- Advertisement -

তবে কোচিং সেন্টার খোলার প্রক্রিয়াটি মোটেই সহজ ছিল না। এক্ষেত্রেও  বাধা অর্থাভাব। ফিরদৌস আলি বলেন, খেলাধুলোর ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। সেজন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি কোচিং সেন্টার খুলেছি। সেখানকার কিছু খেলাধুলোর সরঞ্জামের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেগুলি কেনার টাকা ছিল না। তাই ঠ্যালা চালানোর পাশাপাশি বালি, পাথর সরানোর কাজ করে পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় করে সেগুলি কিনেছি। তিনি আরও বলেন, তিনবার আন্তর্জাতিক ও চারবার জাতীয় স্তরের অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। প্রত্যেকবারই পদক জিতেছি। আমার ছাত্ররাও সাফল্য পাক এই আশা রাখি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ মাস্টার্স অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দৌড়ে তিনটি পদক জিতেছিলেন ফিরদৌস। ২০১৮ সালে মাস্টার্স অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের ইন্দো-বাংলা অ্যাথলেটিক মিটে এক হাজার মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছিলেন। এছাড়াও একাধিক জাতীয়, আন্তর্জাতিক পদক রয়েছে তাঁর দখলে।

মতি নন্দীর ক্ষিদদার ফাইট কোনি ফাইট শব্দগুলি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে ফিরদৌসের জীবনে। ফাইট করে এতগুলি পদক জেতা কোচবিহারের ক্ষিদদাও তাঁর ছাত্রদের মধ্যে এই লড়াইয়ে মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে চান।