বামেরা ভোট ফিরে পেলে দক্ষিণ দিনাজপুরে লাভ তৃণমূলের

1331

দক্ষিণ দিনাজপুর ব্যুরো : দক্ষিণ দিনাজপুর সম্ভবত রাজ্যে একমাত্র জেলা যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি দুপক্ষই একটা ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে চলেছে। পাশাপাশি এখনও বামেরা এই জেলায় নিজস্ব ভোটব্যাংক আর সংগঠন নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ফলে কিছুটা হলেও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় আগামী বিধানসভা ভোটে ত্রিমুখী লড়াইয়ে সম্ভাবনা থাকছে। সংখ্যালঘু আর রাজবংশী ভোটব্যাংক সেই লড়াইয়ের সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করছে। গত বিধানসভা ভোটে রাজ্যজুড়ে যখন তৃণমূলের জোয়ার তখনও দক্ষিণ দিনাজপুরে বাম-কংগ্রেস জোট অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করেছিল। গঙ্গারামপুরে কংগ্রেস প্রার্থী জেতেন। বালুরঘাট, কুশমণ্ডি ও হরিরামপুর দখল করে বামেরা (মূলত সিপিএম এবং আরএসপি) তাদের সাংগঠনিক শক্তির ছাপ রেখেছিল। শুধুমাত্র কুমারগঞ্জ ও তপন বিধানসভা আসনে তৃণমূল প্রার্থীরা জিতেছিলেন। জেলায় ৬ আসনে লড়াইয়ে নেমে ৪-২ ফলে হার তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।

জেলার ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ দিনাজপুর ২০১১ সাল ছাড়া কোনওদিনই তৃণমূলের হয়নি। ২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোটকে জেলার মানুষ তৃণমূলের পক্ষে রায় না বলে রিগিংয়ের জয় বলে মনে করেন। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচন বা ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ দিনাজপুরের মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছেন। ফলে ২০১৬ সাল থেকে এখানে সংগঠন ও মানুষের কাছে দলকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো নেতা খুঁজতে হয়েছে তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বকে। এখনও সেই প্রক্রিয়াই চলছে। জেলা তৃণমূলের বর্তমান সভাপতি গৌতম দাস বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসাবে গঙ্গারামপুরে জিতেছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি যখন বিপ্লব মিত্রের হাত ধরে তৃণমূলে আসেন সেইসময় দুই গোষ্ঠী অর্পিতা ঘোষ আর বিপ্লব মিত্রের মধ্যে শুম্ভনিশুম্ভের  লড়াই চলেছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে এই গোষ্ঠী লড়াইয়ের ট্র‌্যাডিশন প্রায় এক দশকের। জেলায় তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে হাল ধরেছিলেন দাপুটে নেতা বিপ্লব মিত্র। ২০১৬-র গোড়া পর্যন্ত তাঁর একচেটিয়া দাপটে সেসময় দলের মধ্যেই চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই অসন্তোষের কথা নেত্রীর কানে পৌঁছে দিয়েছিলেন শংকর চক্রবর্তী, বাচ্চু হাঁসদার মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আচমকাই বিপ্লব মিত্রকে ছেঁটে ফেলে দল। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পান শংকরবাবু। সৎ ও দক্ষ আইনজীবী হিসাবে শংকরবাবুর সুখ্যাতি থাকলেও রাজনীতিবিদ ও সংগঠক হিসাবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ২০১৬ সালে তৃণমূল জেলায় মাত্র দুটি আসন পায়। অশনিসংকেত পেয়ে দল আবার বিপ্লববাবুকেই জেলার দায়িত্বে ফেরায়। ২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোটে ব্যাপক রিগিং, বুথ দখল করে তৃণমূল প্রায় একতরফা ক্ষমতায় আসে। কিন্তু দলের এই ক্ষমতা দখলকে সাধারণ মানুষ তো বটেই, দলের সাধারণ সমর্থকরা বা বর্ষীয়ান নেতারা ভালো চোখে নেননি। ২০১৯ সালে লোকসভার প্রার্থী হওয়া নিয়ে অর্পিতা ঘোষের সঙ্গে বিপ্লববাবুর বিরোধ চরমে ওঠে। তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরাও বলেন, সেবার বিজেপির কাছে নয়, বিপ্লব মিত্রের কাছেই হেরে যান লোকসভায় তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা। বিপ্লববাবুর এই ভূমিকায় প্রচণ্ড বিরক্ত হন মমতা। ২৩ মে লোকসভা ভোটের ফল বেরোনোর ঠিক দুদিন বাদে জেলা সভাপতির পদ থেকে বিপ্লব মিত্রকে সরিয়ে দেন তিনি। জেলা সভাপতি হন অর্পিতা।

- Advertisement -

জেলায় তার জের এসে পড়ে। অর্পিতা দলের দায়িত্ব হাতে পেয়ে দাপটের রাজনীতি শুরু করেন। বিপ্লব-ঘনিষ্ঠদের সব পদ থেকে সরিয়ে কোণঠাসা করে দেন। নিজের অনুগত দেবাশিস মজুমদার, শুভাশিস পালের মতো নেতাদের সামনে রেখে দল ও বিরোধীদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন। পঞ্চায়েত ভোটে যে গোটাদশেক গ্রাম পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে ছিল অর্পিতা তাতেও থাবা বসানোর চেষ্টা করেন। বিরোধী দল থেকে একের পর এক নেতা-কর্মী সেসময় তৃণমূলে আসেন। কিন্তু  ২০১৮-র পঞ্চায়ে ভোটে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে রিগিং, বুথ দখলের অভিযোগ ছিল অর্পিতার কাজকর্ম যেন তাতে সিলমোহর দেয়। ২০১৯-এর জুনে জেলা থেকে তৃণমূলকে উচ্ছেদের শপথ নিয়ে কোণঠাসা বিপ্লববাবু বিজেপিতে যান। তাঁর সঙ্গে দল ছাড়েন বিপ্লববাবুর ভাই প্রশান্ত মিত্র সহ জেলা পরিষদের ১০ সদস্য। বিপ্লববাবুরা দল ছাড়ার পর অর্পিতার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে আবার ক্ষোভ দানা বাঁধে দলে। প্রশাসনিক কাজকর্মেও অর্পিতার খবরদারি সব মহলেই ক্ষোভ তৈরি করে। শংকর চক্রবর্তী, বাচ্চু হাঁসদা, তোরাব হোসেন মণ্ডলরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে এক গোপন বোঝাপড়ায় আবার তৃণমূলে ফিরে আসেন বিপ্লব মিত্র এবং তাঁর ভাই।

অর্পিতা-বিপ্লব এই কাজিয়া থেকে নিষ্কৃতি পেতেই কিছুটা আচমকা গৌতম দাসকে দায়িত্ব দেয় দল। বিপ্লব মিত্রের হাত ধরে তৃণমূলে আসা গৌতমবাবু কিন্তু জেলায় আবার বিপ্লব-জমানা শুরু হতে দেননি। বরং নিজের মতো দল সাজাচ্ছেন তিনি। অর্পিতার সময় দুই সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস মজুমদার ও শুভাশিস পালকে সরিয়ে গৌতমবাবু সাধারণ সম্পাদক ও কোঅর্ডিনেটরের যৌথ দায়িত্ব পান। এরপর জেলা সভাপতি হয়ে গৌতমবাবু ওই দুজনকে শোকজ করে কার্যত বসিয়ে দেন সক্রিয় রাজনীতি থেকে। তাঁদের সঙ্গেই কোপ পড়ে অর্পিতার অন্যতম সঙ্গী সুনির্মলজ্যোতি বিশ্বাসের ওপর। অন্যদিকে, জেলায় আটজনের কোর কমিটিতে শংকর চক্রবর্তী, বাচ্চু হাঁসদার মতো নেতারা থাকলেও বিপ্লব মিত্র ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের জায়গা দেননি গৌতমবাবু। ফলে দক্ষিণ দিনাজপুরে তৃণমূলের নতুন অধ্যায় শুরু হল বলে মনে করছেন অনেকেই। তার ফল কী হয়, তা বোঝা যাবে আগামী বিধানসভা ভোটে।

অন্যদিকে, বিজেপিতে একইভাবে পালাবদলের পর্ব চলছে। বিপ্লববাবুর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে বালুরঘাট আসন দখলের পর থেকে বিজেপি যেন জেলায় সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে গিয়েছে। কর্মসূচি থাকলেও নেতাদের গা-ছাড়া মনোভাবে নীচুতলার কর্মীরা অনেকেই ক্ষুব্ধ। তার ওপর জেলায় আরএসএস-এর খবরদারিতেও বিজেপির পুরোনো কর্মীদের অনেকে কিছুটা বিরক্ত। ২০১৮-য় পঞ্চায়েত নির্বাচনে আচমকা এখানে বিজেপি বেশ ভালো ভোট পায়। ১০টি পঞ্চায়েত আসন দখল করার পাশাপাশি জেলা পরিষদের কয়েকটি আসনেও ভালো লড়াই করে। পঞ্চায়েত ভোটের পর থেকে লোকসভা ভোটের আগে পর্যন্ত আগে রাম পরে বাম স্লোগান তুলে আরএসএস-এর কট্টরবাদী নেতারা জেলা রাজনীতিতে হইচই জুড়ে দেন। সেসময় কংগ্রেসের জেলা সভাপতি নীলাঞ্জন রায়, কুমারগঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক মাফুজা খাতুন দলে আসেন। ২০১৯-এ আরএসএস-এর ঘনিষ্ঠ সুকান্ত মজুমদার প্রার্থী হয়ে লোকসভায় জেতার পর আরএসএস-এর খবরদারি আরও বেড়েছে। শুভেন্দু সরকারকে সরিয়ে সংঘ ঘনিষ্ঠ বিনয় বর্মনকে জেলা সভাপতি করে দল। কিন্তু বিজেপির সেই ঝড় জেলায় অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। অন্য দল থেকে আর কোনও নেতাকে বিজেপি আর দলে টানতে পারেনি।

আমরা সমীক্ষা করে দেখেছি, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা এখনও বামেদের শক্ত ঘাঁটি। ২০১৯-এ বামেদের ভোট কেটেই লোকসভায় বিজেপি জিতেছিল। পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জেলার বামপন্থী লোকজন লোকসভায় বিজেপির হাত শক্ত করেছিল। কিন্তু আগামী বিধানসভা ভোটে সেই হাওয়া অনেকটাই ঘুরবে। দেশজুড়ে সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর নির্যাতন জেলার বামপন্থী ভোটকে আর বিজেপির দিকে যেতে দেবে না। আর বাম ভোট বামেদের দিকে ফিরলে তাতে আখেরে লাভ হবে তৃণমূলের। জেলায় ২২ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের সিংহভাগই তৃণমূলের দিকে যাবে। বিশেষ করে হরিরামপুর, কুমারগঞ্জে সংখ্যালঘু ভোটেই প্রার্থীদের ভাগ্য ঠিক হবে। বাম-কংগ্রেস জোট তাদের নিজস্ব সংখ্যালঘু ভোট ফিরে পেলে তাতে তৃণমূলেরই লাভ হবে।  আমাদের সমীক্ষা বলছে, কৃষকদের ভোট এবার জেলার বেশিরভাগ কেন্দ্রে অন্যতম নির্ণায়ক। গত লোকসভায় এই ভোট একচেটিয়া বিজেপির দিকে পড়েছিল। এবার সেই ভোটের অন্তত ৩০ শতাংশ বিজেপি হারাবে।  সেই ভোট যাবে তৃণমূল ও বামেদের ভাগে। মনে রাখতে হবে, জেলার প্রায় ৩০ শতাংশ রাজবংশী ভোটের দিকে নজর রেখে মুখ্যমন্ত্রী যেসব সুযোগসুবিধা দিয়েছেন তাতে রাজবংশীরা বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আগে অবশ্যই ভাববেন। তবে, গত কয়েকবছরে জেলায় রাজবংশীরা যেভাবে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন তা নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলের কাছে অশুভ সংকেত।

কন্যাশ্রী,  রূপশ্রীর মতো প্রকল্প, এসসি-এসটি ভাতা, কৃষকবন্ধু প্রকল্প, লোকশিল্পীদের ভাতা তৃণমূলকে অনেকটা অ্যাডভান্টেজ দিচ্ছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতাদের কোন্দল, গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখার প্রবণতা, প্রশাসনিক কাজে খবরদারি, বিভিন্ন প্রকল্পের উপভোক্তাদের থেকে কাটমানি নেওয়া তৃণমূলের কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরতে পারে। তার ওপর জেলায় মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ না করা, এসএসসি সহ রাজ্য সরকারি চাকরি নিযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষিতদের তৃণমূলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। তৃণমূল জমানায় প্রাপ্তি আর ক্ষোভ দুটিরই চুলচেরা বিচার করেই দক্ষিণ দিনাজপুর বিধানসভা ভোটে তাদের রায় দেবে।