পরিত্যক্ত মোবাইল টাওয়ারে বিপদের শঙ্কা

260

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : মোবাইল সংস্থা উঠে গিয়েছে, কিন্তু টাওয়ারগুলি রয়ে গিয়েছে। আর পরিত্যক্ত এই টাওয়ারগুলিকে কেন্দ্র করে রোজকে রোজই বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে। গত চার-পাঁচ বছরে এই টাওয়ারগুলির ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত হয়নি। জোর ভূমিকম্প, ঝড়ে এই টাওয়ারগুলি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে জমিদাতাদের আশঙ্কা।

টাওয়ার ভেঙে কেজিদরে বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা য়ে কারও মাথায় আসেনি তা নয়। এসেছে। কিন্তু টাওয়ার ভেঙে কেজিদরের লোহালক্কড়ে পরিণত করা চাট্টিখানি কথা নয়। তার ওপর সংস্থাগত সম্পত্তি হওয়ায় আইনি গেরোর ভয়ও আছে। তাই আপাতত টাওয়ারগুলি দুর্ঘটনার আশঙ্কা বজায় রেখে বহাল তবিয়তেই স্বস্থানে বজায় রয়েছে। ধূপগুড়ি শহরে এই জাতীয় গোটা তিনেক টাওয়ার রয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা ধরলে সংখ্যাটি প্রায় ৩০ হবে। গোটা উত্তরবঙ্গে এই জাতীয় ২৫০টি টাওয়ার কোনও কাজ ছাড়াই আকাশপানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। টাওয়ারগুলির বেশিরভাগ ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকায় বিপদের আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।

- Advertisement -

কয়েক বছর আগের কথা ধরা যাক। রাষ্ট্রায়ত্ত ভিএসএনএল, বিএসএনএল, এমটিএমএল ছাড়াও দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ১৫টি সংস্থা মোবাইল পরিষেবা দিত। এজন্য সংস্থাগুলি নিজেরা টাওয়ার তৈরির পাশাপাশি অন্য সংস্থার তৈরি টাওয়ার ভাড়া নিয়ে পরিষেবা সংক্রান্ত কাজ চালাত। এই টাওয়ারগুলির বেশিরভাগই ২০০৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। যাঁর জমি বা বাড়িতে টাওয়ার বসানো হত তাঁকে মাসিক ভাড়া দেওয়া ছাড়াও টাওয়ারগুলি দেখভালের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি পরিবারের এক-দুজনকে চাকরিও দিত। এভাবে এক-একটি টাওয়ার থেকে এক-একটি পরিবারের মাসে বেশ কয়েক হাজার টাকা রোজগার হত। জমিদাতা বা বাড়ির মালিকের সঙ্গে ১০-১২ বছরের চুক্তি হত। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও একটা সময় পরে টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির জেরে বেশ কয়েকটি সংস্থা ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হয়।

আর এরপরই সমস্যার শুরু। ব্যবসা নেই, তাই পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলা সংস্থাগুলি আর টাওয়ার নিয়ে কোনওভাবেই মাথা ঘামায় না। থার্ড পার্টি সংস্থাগুলিরও আর টাওয়ার নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। টাওয়ারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁরাও সরে পড়েছে। বেশ কয়েকটি সংস্থা নিজেদের অফিস গুটিয়ে নিয়েছে।  কিন্তু যাঁদের জমি বা বাড়িতে ৪০-৫০ ফুট উঁচু এই টাওয়ারগুলি তৈরি করা হয়েছিল তাঁরা প্রবল দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।

ধূপগুড়ি মিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা দীপক সাহা মাসিক সাত হাজার টাকা ভাড়া এবং দেখভালের জন্য ছেলের চাকরির বদলে এক  সংস্থাকে ২০০৮ সালে বাড়ির সীমানায় ৪০ ফুট উঁচু টাওয়ার বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। ১২ বছরের চুক্তি বছর দেড়েক আগে শেষ হয়। তবে গত পাঁচ বছর ধরে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কোনও পাত্তা নেই। য়ে সংস্থার তরফে টাওয়ার বসানো হয়েছিল তাদের শিলিগুড়ি অফিসে আজকাল তালা ঝোলে। কলকাতায় গিয়ে সংস্থার অফিসের কোনও খোঁজ মেলেনি। সংস্থার চেন্নাইয়ের হেড অফিসে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ওই অফিস বন্ধ থাকায় তা ফেরত আসে। পরিত্যক্ত টাওয়ার আজ বিশাল দৈত্যের মতো দীপকবাবুর জমিতে দাঁড়িয়ে। দীপকবাবু বলেন, ২০১৬ সালে শেষবার কয়েকজন এসে টাওয়ারের বিদ্যুৎ ও কেবল কানেকশন কেটে দিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে সংস্থার লোকদের কোনও পাত্তা নেই। ভাড়াও নেই। বিশালকার এই টাওয়ার নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার শেষও নেই। দীপকবাবুর মতো আরও অনেকেই একই সমস্যায় ভুগছেন।

ধূপগুড়ি পুরসভার উপপুরপ্রধান রাজেশকুমার সিং বলেন, বেশ কয়েক বছর এই টাওয়ারগুলির ট্রেড লাইসেন্স রিনিউয়াল না হওয়ায় আমরা খোঁজখবর শুরু করি। তবে পরিত্যক্ত এই টাওয়ারগুলি য়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে তা ভেবে দেখিনি। দ্রুত উপরমহলকে এ বিষয়ে অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।