গরিমা হারাচ্ছে দার্জিলিং চা, পড়ে থাকলেও কেনার কেউ নেই

88

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : অস্তিত্বের সংকটে ব্র‌্যান্ড দার্জিলিং চা। স্বাদ, গন্ধের নিরিখে আন্তর্জাতিক বাজারে এই চায়ের আলাদা একট কৌলীন্য আছে। এই চা কিনতে ক্রেতাদের মধ্যে একটা সময় রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হত। এখন অবশ্য ছবিটা অন্য। বর্তমানে পরিস্থিতি এমনই যে এই চা পড়ে থাকলেও কেনার কেউ নেই। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, করোনার কোপেই দার্জিলিং চায়ের এই হাল। বাস্তবে হুহু করে উৎপাদন হ্রাস, তীব্র শ্রমিক সংকট সহ নানা কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এই চায়ের হাল খারাপ হয়েছে।

২০০৩ সালে দার্জিলিং পাহাড়ের ৮৭টি চা বাগানের তৈরি চা জিআই মর্যাদা পায়। নিয়মানুযায়ী, শুধুমাত্র এই চা-ই বাজারে দার্জিলিং চা হিসাবে বিক্রি হবে। এর বাইরে অন্য কোনও বাগান তাদের চা দার্জিলিং চা হিসাবে বিক্রি করতে পারে না। এই সুবাদেই ব্র‌্যান্ড হিসাবে এই চায়ের আরও ছড়িয়ে পড়া। কিন্তু বর্তমানে ছবিটা বদলেছে। গত দুবছরে দার্জিলিং চায়ের রপ্তানি ১০ শতাংশ কমেছে। চা রপ্তানিকারী সংস্থাগুলির সূত্রে খবর, দার্জিলিং চায়ের বার্ষিক উৎপাদন ৮,৫০০ টন থেকে কমে ৬,৫০০ টন হয়েছে। আগে বছরে গড়ে ৪,২০০ টন চা রপ্তানি হত। ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে তা কমে ৩,১০০ টন হয়। শিলিগুড়ি টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুসারে, দার্জিলিং চা বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ১,৫০০-৪,৫০০ টাকা কিলো দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চ ও এপ্রিলে ফার্স্ট ফ্লাশ এবং জুনে সেকেন্ড ফ্লাশের দার্জিলিং চা বাজারে আসে। এই দুই ফ্লাশেই সেরা দার্জিলিং চায়ের মরশুম। টি বোর্ডের তথ্য, এই এপ্রিলে ৬৬০ টন দার্জিলিং চা উৎপন্ন হয়। ২০২০ এবং ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯২০ এবং ১,২৮০ টন। হিসাবেই পরিষ্কার, গত দুই বছরে দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন কমে অর্ধেক হয়েছে।

- Advertisement -

আর এতেই চা বিশেষজ্ঞরা অশনিসংকেত দেখছেন। দার্জিলিং চা বিশেষজ্ঞ কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় বলছেন, দার্জিলিংয়ের বাগানগুলিতে বছরের পর বছর ধরে গাছ পরিবর্তন করা হচ্ছে না। গাছের বয়স বাড়ায় উৎপাদন কমছে। তাছাড়া প্রতি বছরই স্বাভাবিক নিয়মে গাছের মৃত্যুতে উৎপাদন এলাকাও কমছে। নতুন গাছে গুণগতমানের চা মিলবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কোনও বাগান মালিকই গুণগতমানের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি নন। অন্যদিকে, পাতা তোলা, কারখানায় কাজের শ্রমিক মিলছে না। চাষ, বিক্রির পদ্ধতি, গুণগতমানে দ্রুত পদক্ষেপ না করলে দার্জিলিং চায়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

চা গবেষক, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ একটি বিষয়ে একমত। তাঁদের মতে, দার্জিলিং চায়ের বিকল্প হিসাবে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে সুপরিকল্পিতভাবেই নেপালের চা ঢোকানো হচ্ছে। দার্জিলিংয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ চা জার্মানিতে রপ্তানি হয়। দ্বিতীয় স্থানেই জাপানের টোকিও। লন্ডন, আমেরিকা সহ বিশ্বের বহু দেশেই দার্জিলিং চায়ের আলাদা চাহিদা আছে। জার্মানি ও জাপানে দার্জিলিং চায়ের বিকল্প হিসাবে নেপালের চা জাঁকিয়ে বসেছে। সূত্রের খবর, নেপালের চা-কে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় করতে ডেনমার্ক প্রযুক্তিগত সহায়তা করছে। নেপালের চাহিদা অনুসারে বিশেষ অর্থডক্স চা তৈরিতে ডেনমার্ক থেকে ছোট ছোট কয়েক হাজার মেশিন নেপালে এসেছে। এগুলি ব্যবহারের বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রযুক্তিতে নেপালে তৈরি কয়ে মিলিয়ন কেজি চা প্রতি বছর ভারতের বাজারে ঢুকছে। তারপর সেগুলি দার্জিলিং চায়ের নামে প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। যার দরুন দার্জিলিং চায়ের স্থানীয় বাজারও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ওই চা বিদেশের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। এই চায়ের গুণগতমান খারাপ হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে দার্জিলিংয়ের নাম খারাপ হচ্ছে।

২০১৭ সালে ১০৪ দিনের টানা পাহাড় বনধের ফলে সেবারে দার্জিলিংয়ে চা বিদেশের বাজার থেকে কার্যত উধাও হয়ে যায়। সেই সুযোগেই আন্তর্জাতিক বাজারে নেপালের চায়ে পরিচিতি। টি বোর্ডের তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালে ৮,১৩০ টন দার্জিলিং চা উৎপাদন হয়। সেবছর প্রায় ৯০ শতাংশ চা বিদেশে গিয়েছিল। ২০১৭ সালে শুধুমাত্র ফার্স্ট ফ্লাশের কিছু চা রপ্তানি হয়। সেই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে চার হাজার টাকায় দার্জিলিং চা বিক্রি হয়েছিল। ২০১৭ সালের আগে নেপালের চায়ের গড় দাম কিলো প্রতি ৪০০ টাকা ছিল। চাহিদা বাড়ায় এর দাম বেড়ে ৯০০ টাকা হয়।

দার্জিলিং চা নিয়ে আন্তর্জাতিক চা কমিটি উদ্বিগ্ন। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়ান গিবস এনিয়ে খোঁজখবর চালাচ্ছেন। কমিটির ভারতীয় প্রতিনিধি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, নেপালের চায়ের অবৈধ অনুপ্রবেশেই দার্জিলিং চায়ের বাজার নষ্ট হচ্ছে। টি বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রভাতকমল বেজবরুয়ার বক্তব্য, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। দার্জিলিং চা-কে বাঁচাতে আমরা পদক্ষেপ করব।