উত্তরবঙ্গে চা বাগান এখনই খুলছে না : মুখ্যমন্ত্রী

541

কলকাতা : কেন্দ্রীয় সরকার সম্মতি দিলেও রাজ্য সরকারের আপত্তিতে আপাতত চা বাগান খুলছে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, চা বাগানে সঙ্গে জড়িত অনেকে ভয় পাচ্ছেন যে, স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হলে চা বাগিচা এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের বলেছিল চা বাগান খুলে দিতে। কিন্তু চা বাগানের সবাই বলছেন যেহেতু ওই এলাকায় বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও অসম সীমান্ত রয়েছে, ফলে একসঙ্গে অনেকে কাজ করলে পরিস্থিতি বিপদজনক হতে পারে।’

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘আজকেই চা বাগান খোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। এখনই খুলে দিলে সব হচপচ হয়ে যাবে। ট্রেন্ডটা ভালো নয়।’ রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পাহাড়ের চায়ের ফার্স্ট ফ্লাশ তো বটেই, সেকেন্ড ফ্লাশ  তোলারও কোনও সম্ভাবনা রইল না। ডুয়ার্স-তরাইয়েও মরশুমি চা উত্পাদন আরও কিছুদিন বন্ধ থাকবে। ফলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে উত্তরবঙ্গের চা শিল্প।

- Advertisement -

চা শিল্পের পরিভাষায় মরশুমের প্রথম চা-পাতাকে ‘ফাস্ট ফ্লাশ’ বলা হয়ে থাকে। এই চায়ের প্রায় ৮০ শতাংশ নিলাম ছাড়াই বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। এই ফাস্ট ফ্লাশ পাহাড়ের বাৎসরিক উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। পাহাড়ের চা শিল্পের বছরে মোট রাজস্বের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আয় হয় মরশুমের এই উৎপাদন থেকে।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সর্বাধিক ৫ দিন পর পর এই চা পাতা তোলা হয়ে থাকে। এবার আবহাওয়াও মরশুমের প্রথম চা উৎপাদনের অনুকূল ছিল। শীতের শেষাশেষি ভালো বৃষ্টি এবং বেশি তাপমাত্রা এই সময়ে পাহাড়ের চা আবাদের পক্ষে অত্যন্ত ভালো। এবার সেটাই ছিল। কিন্তু ভালো উৎপাদন ও তার ফলে ভালো বাণিজ্যের সম্ভাবনায় জল ঢেলে দেয় মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের শুরু হওয়া লকডাউন। লকডাউন কবে প্রত্যাহার হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা না থাকায় দুর্ভাবনায় পড়েছেন চা শিল্পপতিরা। আর আজকের ঘোষণার পর সেকেন্ড ফ্লাশও মার খাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এপ্রিলের মাঝামাঝির পর থেকে মে মাসের মধ্যে ওই ফ্লাশ আসে। এর দামও প্রথম ফ্লাশের মতোই। গড়ে মরশুমের প্রথম দুটি উৎপাদনের চা আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে ১১০০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়ে থাকে। সেকেন্ড ফ্লাশে বাৎসরিক উৎপাদনের ২৫ শতাংশ আসে। এই দুটি ফ্লাশে বছরে উৎপাদন হয়ে থাকে প্রায় ৪ মিলিয়ন কেজি। ১৪ এপ্রিলের পর লকডাউন উঠে গেলেও এই ক্ষতি পুরোটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

কেননা, চা গাছের আগা ছেঁটে দেওয়ার (স্থানীয় ভাষায় ঝুরনি) পরেও নতুন চা পাতা জন্মাতে ২৫ থেকে ৩১ দিন লেগে যায়। ফলে ফাস্ট ফ্লাশ তো বটেই সেকেন্ড ফ্লাশের সময় ততদিনে পার হয়ে যাবে। এখনও পর্যন্ত পাহাড়ের চা শিল্পে এই লকডাউনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫০০ কোটি টাকার বেশি। এই পরিস্থিতিতে ওই ক্ষতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা। এমনিতেই ২০১৭ সালে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের জেরে পাহাড়ে ১০৪ দিনের শাটডাউনের ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি চা শিল্প। তার মধ্যে করোনা আতঙ্ক এই শিল্পে বিরাট আঘাত নামিয়ে আনছে।

উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গে রয়েছে ২৯০টি চা বাগান। এর মধ্যে ডুয়ার্সে ১৫৮টি, দার্জিলিংয়ে ৮৭ এবং তরাইয়ে ৪৫টি বাগান। এই বাগানগুলি থেকে বছরে প্রায় ৩৫৩ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়। পরিস্থিতি যা তাতে ৪৫-৫০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা করছেন চা শিল্পপতিরা। লকডাউন আরও কিছুদিন চললে ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। উত্তরবঙ্গে সব মিলিয়ে সাড়ে তিন লক্ষ চা শ্রমিক রয়েছেন। বাগানের ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ১৫ লক্ষ মানুষ।