রেলের উদাসীনতা নাকি যাত্রীর অভাব, চ্যালেঞ্জের মুখে দার্জিলিংয়ের টয়ট্রেন

89

রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি : ইউনেসকোর হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে টয়ট্রেন পরিষেবা নিয়ে কি আদৌ ভাবনাচিন্তা করে ভারতীয় রেল? দীর্ঘদিন ধরে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর) যেভাবে চলছে, তাতে রেলের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। রেলের উদাসীনতা ও একের পর এক তুঘলকি সিদ্ধান্তে প্রতিদিন যাত্রীর সংখ্যা কমছে। কোভিড পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত টয়ট্রেন পরিষেবা বন্ধ। এখন দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত জয়রাইড চললেও তার ভাড়া এতটাই বেশি যে, পর্যটকরা তা থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। অল্প সংখ্যক বিদেশি পর্যটকই ওই জয়রাইডে চাপছেন। এভাবে জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে দার্জিলিংয়ে টয়ট্রেনের হেরিটেজ তকমা ধরে রাখাই রেলের কাছে চ্যালেঞ্জ হবে। যদিও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ট্রেন না চালানোর জন্য যাত্রীর অভাবকে দায়ী করেছে রেল। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর) ডিরেক্টর একে মিশ্রর দাবি, নিউ জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং টয়ট্রেনের চাহিদা নেই তাই চালানো হচ্ছে না। তবে জয়রাইড চালানো হচ্ছে।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ৮৩ কিলোমিটার রেলপথে একসময় প্রথম শ্রেণির পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণির কামরাও ছিল। কয়েক বছর আগেও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ভাড়া ছিল ৪০০ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া ছিল প্রথম শ্রেণির তিনভাগেরও কম। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত পর্যটক ও শিলিগুড়ির বাসিন্দারা এই টয়ট্রেনে দার্জিলিং যেতে পছন্দ করতেন। কিন্তু হঠাৎই দ্বিতীয় শ্রেণির কামরা বাতিল করে দেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণির ভাড়াও এক লাফে বেড়ে ১২৩৪ টাকা হয়ে যায়। লকডাউনের আগে পর্যন্ত এই ভাড়াতেই ট্রেন চলত। কিন্তু কোভিড পরবর্তী সময়ে দার্জিলিং থেকে ঘুম ডিজেল ইঞ্জিন জয়রাইড পরিষেবার প্রথম শ্রেণির ভাড়া রাখা হয়েছে ১০০০ টাকা। স্টিম লোকো জয়রাইডে ভিআইপি কোচের ভাড়া হয়েছে ১৬০০ টাকা। পরিষেবা চালু না হলেও নিউ জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং রুটে সাধারণ প্রথম শ্রেণির ভাড়া ১৪২০ ও এসি প্রথম শ্রেণির ভাড়া ১৭০০ টাকা হয়ে গিয়েছে।

- Advertisement -

তবে কার্সিয়াং থেকে দার্জিলিং রুটের দুটি ট্রেনে দ্বিতীয় শ্রেণির দুটি করে কামরা রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া রাখা হয়েছে ২৮১ টাকা। কিন্তু এই ভাড়াও তুলনমূলকভাবে অনেকটাই বেশি। এছাড়াও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রংটং পর্যন্ত জঙ্গল সাফারি নামে একটি জয়রাইড চালু করা হয়েছিল যার ভাড়া ছিল প্রথম শ্রেণির কামরার জন্য ১০০০ টাকা এবং ডাইনিং কারের জন্য ১২০০ টাকা। বেশি ভাড়া এবং প্রচারের অভাবের জন্য এই পরিষেবাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

কোনও বেসরকারি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ডিএইচআরের তরফে চার্টার্ড ট্রেন চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ভাড়াও আকাশছোঁয়া হওয়ায় বহু সংস্থা পুরো ট্রেন ভাড়া করতে গিয়ে পিছিয়ে আসছে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রংটং পর্যন্ত স্টিম ইঞ্জিন চালিত ও দুটি কামরা সংবলিত চার্টার্ড ট্রেনের সিঙ্গল ট্রিপ ভাড়া ৮০,৮৫০টাকা। একই ট্রেনের রাউন্ড ট্রিপ ভাড়া ১ লক্ষ ২১ হাজার ২৭৫ টাকা। শিলিগুড়ি থেকে তিনধারিয়া এবং তিনধারিয়া থেকে কার্সিয়াংয়ের ক্ষেত্রে চার্টার্ড টয়ট্রেনের একই ভাড়া রাখা হয়েছে। ডিজেল ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে এই ভাড়া ১০ হাজার টাকা করে কম।

ভারতেরই আরও দুটি ইউনেসকোর হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত কালকা-সিমলা রেলওয়ে ও নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ের ভাড়া অনেকটাই কম। কালকা-সিমলা টয়ট্রেন রুটে শিবালিক ডিলাক্স, হিমালয়ান কুইন ও সিমলা-কালকা এক্সপ্রেস চলে। এগুলির ভাড়া যথাক্রমে ৫০০, ২৬০ ও ৭০ টাকা। শিবালিক ডিলাক্সে ওই ভাড়ায় যাত্রীদের ব্রেকফাস্ট পরিষেবাও দেওয়া হয়। এছাড়া ওই রুটে রেল মোটর ও একটি অসংরক্ষিত প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলাচল করে। রেল মোটরের ভাড়া ৩০০ টাকা। আবার নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ের ভাড়া কোভিড পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০০ শতাংশ বাড়লেও সর্বোচ্চ ভাড়া হয়েছে ৬০০ টাকা।

প্রশ্ন উঠছে, কালকা-সিমলা বা নীলগিরি মাউন্টেন টয়ট্রেন পরিষেবা এত কম ভাড়ায় চলতে পারলেও ডিএইচআর কেন পারছে না? ঠিক কী যুক্তিতে ডিএইচআর এত বেশি ভাড়া নিচ্ছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। যদিও রেলের দাবি, যাত্রী কম হওয়ায় ও পুরোনো হেরিটেজ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতে বেশি ভাড়া নিতেই হবে।

দার্জিলিংয়ে টয়ট্রেন নিয়ে ভারতীয় রেলের উদাসীনতায় ডিএইচআর ইন্ডিয়া সাপোর্ট গ্রুপের সদস্যরা রীতিমতো ক্ষুব্ধ। সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল রাজ বাসু বলেন, ভারতীয় রেল ডিএইচআরকে সৎ সন্তান হিসেবে দেখছে। এত বেশি ভাড়া নিলেও পরিষেবা ঠিক নেই। পর্যটকদের জন্য প্রচারও হয় না। ঠিকমতো ট্রেন চালাচ্ছে না, এতে পর্যটকের সংখ্যাও কমছে।