চন্দন বাগচী, নকশালবাড়ি : আর্থিক সংকট এতটাই যে দুবেলা খাবার জোগাড় করাই ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তারমধ্যেও ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ গড়ে তুলেছেন। অভাবের সঙ্গে লড়ে অধ্যাপিকা হয়ে নকশালবাড়ির করাতি পরিবারের সদস্য তৃষ্ণা দেখিয়ে দিয়েছেন, কোনো কিছুই সাফল্যকে দমিয়ে রাখতে পারে না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রচণ্ড অধ্যবসায় আর কিছু করে দেখানো যাঁর স্বপ্ন তাঁর কাছে দারিদ্র‌্য, অভাব- এসব বোধহয় কোনও বাধাই বাধা নয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটাই দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারেন নকশালবাড়ির তৃষ্ণা করাতি। একজন অধ্যাপিকা হয়ে সবার নজর কেড়েছেন। অনেক চড়াইউতরাই, সীমাহীন দুঃখকষ্ট, অবজ্ঞা, ঈর্ষাকে হেলায় উড়িয়ে তিনি এখন আলিপুরদুয়ার কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপিকা। নকশালবাড়ির দিনমজুর বাবা আর পরিচারিকা মায়ের গর্বিত সন্তান তৃষ্ণার লড়াই-সংগ্রামের কথা এখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে।

তষ্ণাৃর বাবা সুবর্ণ করাতি পেশায় ১৫০ টাকা হাজিরার দিনমজুর। আর মা প্রাণরানি করাতি পরিচারিকার কাজ করেন। দুজনের এই সামান্য রোজগারের উপর ছয়জনের সংসার চলত। প্রাণরানিদেবী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালাতে অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। কিন্তু ছেলেমেয়েদের তা বুঝতে দিতেন না। শুধু বলতেন, আমার কথা তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। তোমরা শুধু মন দিয়ে পড়শোনা করে আমার মনের ইচ্ছে পূরণ করো। মায়ের এই লড়াই সন্তানদের কাছে ছিল অনুপ্রেরণা। মা কাজে ব্যস্ত থাকায় ছোটবেলা থেকেই তৃষ্ণাদের নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়েছে। তৃষ্ণার মা একটি গোরু কিনেছিলেন। সেই গোরুর দুধ বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতেন ছেলেমেয়েরা। সারাদিন খাবারের চিন্তা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকা ছিল দৈনন্দিন রুটিন। প্রাণরানিদেবী জানান, ঠিকমতো ছেলেমেয়েরা খাবার পেত না। কত রাত না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। কিন্তু পড়াশোনায় সকলেই ভালো ছিল। কখনও কেউ ফাঁকি দিত না। ভাইবোনদের মধ্যে পড়াশোনায় তৃষ্ণা ছিলেন তুখোড়। মাধ্যমিকে তৃষ্ণা পেয়েছিলেন ৭৩.৩৭ শতাংশ, উচ্চমাধ্যমিকে ৬৪.৮ শতাংশ, বিএতে ৫৪.৫ শতাংশ, এমএতে ৬০.২৫ শতাংশ। বিএড-এ ৬৯.২ শতাংশ নম্বর পান। এরপর ২০১৮ সালে নেট পাস করেন। এরপর ২০১৯ সালে কলেজ সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ণ হয়ে আলিপুরদুয়ার কলেজে সহকারী অধ্যাপিকা হিসাবে নিয়োগপত্র পান। কাজেও যোগ দিয়েছেন তিনি।

- Advertisement -

তৃষ্ণার দাদা সুফল একসময় সুপারির ব্যবসা করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন। তিনিও ভূগোলে এমএ, বিএড করে নেট পাস করেছেন। তৃষ্ণার আরেক বোন বর্তমানে এমএ পড়ছেন। স্নাতকস্তরে পড়ার সময়ে এক বোনের মৃত্যু হয়। তৃষ্ণাদেবী বলেন, আমাদের কারও ভাগ্যে স্কুল ব্যাগ জোটেনি। আমরা পলিথিনের ক্যারিব্যাগে বই নিয়ে যেতাম। কোনওদিন জুতো জোটেনি, ছিল না ভালো পোশাক। আমাদের পড়াশোনা হয়তো বন্ধই হয়ে যেত। কিন্তু আমাদের মা সেটা হতে দেননি। নিজে পরিচারিকার কাজ করে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। নিরলস পরিশ্রমের আজ সাফল্য মিলেছে। তৃষ্ণাদেবী কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাও করছেন। দুঃসময়ে তাঁর পাশে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কথাও ভোলেননি। তৃষ্ণাদেবী বলেন, ডঃ প্রণব ভট্টাচার্য, ডঃ অনিতা বাগচী সহ অনেক অধ্যাপক আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। আমার মতো যাঁরা কষ্ট করে পড়াশোনা করছেন, আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই।