মানবাধিকার কমিশনের দুষ্কৃতী তালিকায় দিনমজুর

264

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে দিন কয়েক আগেই ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ খতিয়ে দেখে গিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের তরফে বৃহস্পতিবার এনিয়ে হাইকোর্টে রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। রিপোর্টে বিভিন্ন জেলার বেশ কয়েকজন বিধায়ক সহ রাজ্যের এক মন্ত্রী ও তৃণমূলের বেশ কিছু কর্মীকে কুখ্যাত দুষ্কৃতী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় নাম রয়েছে হরিশ্চন্দ্রপুরের দুই তৃণমূল কর্মীরও। তাঁদের একজন হলেন জেলায় তৃণমূত কংগ্রেসেরA ম্যাসকট হিসাবে পরিচিত দিনমজুর জয়দেব ওঝা।

ভোটের আগে জয়দেববাবু রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে দলের বিভিন্ন জনসভায় গিয়েছেন। কখনও নিজের, কখনও বা দলের খরচে। দিনমজুরি করে কোনওমতে পেট চালান। শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভালোবেসে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যান তৃণমূলের ম্যাসকট সেজে। জয়দেবের ম্যাসকট সাজার খবর ভোটের সময় সংবাদ শিরোনামে ছিল। কিন্তু তাঁর নাম কেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভোটে হিংসা ছড়ানোর দুষ্কৃতী তালিকায় আসল, বুঝতে পারছেন না জয়দেব। উলটে তাঁর দাবি, ভোটের সময় তৃণমূলের ম্যাসকট সাজার জন্য এলাকার বিজেপি কর্মীদের হাতে মার খেতে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকার বিজেপি কর্মীরা থানায় অভিযোগ দায়ে করেছিলেন। বিজেপি কর্মীদের হাতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বেশ কিছুদিন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দুষ্কৃতী তালিকায় তাঁর নাম কীভাবে এল, সেটা এখনও বুঝতে পারছেন না।

- Advertisement -

জয়দেবের নাম দুষ্কৃতীদের তালিকায় আছে শুনে রীতিমতো হতবাক গ্রামবাসীরা। তাঁর প্রতিবেশী ভালুকা বাজারের বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র মহলদার বলেন, জয়দেবকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ও আমার পাশের বাড়ির ছেলে। ওর বাবা অমৃতি শিবমন্দিরে পুজো করেন। নিতান্তই গরিব পরিবারের ছেলে। মাঝেমাঝে তৃণমূলের মিটিং মিছিলে গায়ে রং মেখে চলে যায় দিদিকে ভালোবেসে। কিন্তু ওর নাম দুষ্কৃতী হিসেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কেন সুপারিশ করল, বুঝতে পারছি না। সহজ সরল ছেলেটা দিনমজুরি করে নিজের পেট চালাচ্ছে।

ভালুকা বাজারে শ্রাবণী কালীমন্দিরের পুরোহিত রামবিলাস উপাধ্যায়ের মতে, ভোট পরবর্তী সময়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কোনও সদস্যকে এলাকায় দেখা যায়নি। তাহলে জয়দেবের নাম কেমন করে কমিশনের পেশ করা দুষ্কৃতী তালিকায় স্থান পেল বুঝতে পারছি না। ও খুব গরিব পরিবারের ছেলে। শাসকদলের সমর্থক, এটুকু আমরা জানি। কিন্তু দিনমজুরি করা ওর পেশা। দুষ্কৃতীমূলক কাজকর্মে কোনওদিনও তো ওর নাম শুনিনি। কীভাবে ভোটের সময় হিংসা ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত হল, সেটাই মাথায় ঢুকছে না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরই জেলায় রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো মানবাধিকার কমিশনও কেন্দ্রীয় সরকারের দলদাসে পরিণত হয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের মালদা জেলা নেতৃত্বের। জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী জানান, কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের হয়ে কাজ করছে মানবাধিকার কমিশন। তাদের ব্রিফ করে দেওয়া রিপোর্টই প্রকাশ করেছে কমিশন। কেন্দ্রের কিছু নেতার কথায় কমিশন রিপোর্ট দাখিল করেছে। এই রিপোর্টের কোনও যৌক্তিকতা নেই। হাইকোর্ট এই রিপোর্টের ভিত্তিতে যদি কোনও আইনি নোটিশ পাঠায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা দল থেকে আইনি পদক্ষেপ নেব।

এদিকে জেলা তৃণমূলের সভানেত্রী মৌসম নুর বলেন, দলীয় কর্মীদের হেনস্তা করতেই কমিশন এই রিপোর্ট দাখিল করেছে। এই জেলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা হয় সাধারণ কর্মী, নইলে নিরীহ মানুষ। দলকে বিব্রত করতে এধরনের পদক্ষেপ কমিশনের। বিষয়টি রাজ্য নেতৃত্বকে জানিয়েছি।

এদিকে যাঁর নামে এমন অভিযোগ, তৃণমূলের ম্যাসকট জয়দেব তাঁর ভাঙাচোরা বাড়ির দাওয়ায় বসে জানান, আমি সারাজীবন তৃণমূল করে এসেছি। দলের যখন কর্মসূচি থাকে তখন গায়ে রং মেখে তৃণমূলের ম্যাসকট হয়ে হাজির হয়ে যাই। অন্য সময় দিনমজুরি করে পেট ভরাই। কিন্তু আমার নামে ভোটের সময় রাজনৈতিক হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ কেন দেওয়া হল বুঝতে পারছি না। পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে কি না তাও জানি না।

হরিশ্চন্দ্রপুরের আরেক তৃণমূল কর্মী ও প্রাক্তন সাংসদের প্রতিনিধি সঞ্জীব গুপ্তার নামও কমিশনের তালিকায় রয়েছে। সঞ্জীববাবুর বক্তব্য, জীবনে কোনওদিন কোনও ব্যাপারে পুলিশের খাতায় নাম ওঠেনি। এলাকার কোনও বাসিন্দার সঙ্গে গণ্ডগোল নেই। আমি সামান্য একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। রাজনৈতিকভাবে তৃণমূল করি। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কমিশনের তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ ষড়য়ন্ত্র। এর পিছনে এলাকার বিজেপির নেতারা রয়েছেন।

এপ্রসঙ্গে উত্তর মালদার বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ভোটের সময় শাসকদল নির্বিচারে জেলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল। রাজ্যজুড়ে এখনও অনেক বিজেপি কর্মী ঘরছাড়া। আমি মনে করি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষ তদন্ত করে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এই রিপোর্টে পরিষ্কার হয়েছে, তৃণমূল ভোটে কী হারে সন্ত্রাস করেছে। আমরা কমিশনের রিপোর্টকে স্বাগত জানাই।

এই রিপোর্ট সম্পর্কে ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা সম্পাদক শ্রীমন্ত মিত্র বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রের কিছু এজেন্সি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জার। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেটা যে দলের বিরুদ্ধেই যাক না কেন, তারা নিজেদের দোষ ঢাকতে সেটা চক্রান্তের গল্প বলবে।