শালকুমারহাট : আলিপুরদুয়ার শহরের পাতলাখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের এক গণ্ডগ্রামের নাম হল সাবেবপোঁতা। কেন এমন নামকরণ, তা কারণ এখনও চোখে দেখা যায় এখানে এলেই। প্রায় দেড়শো বছর আগে একসঙ্গে চারজন ইংরেজকে এই জায়গায় কবর দেওয়া হয়েছিল। আর সেই থেকেই জায়গার নাম হয়ে যায় সাহেবপোঁতা।

ফালাকাটা-সোনাপুর জাতীয় সড়কের পাতলাখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেবপোঁতা বাস স্টপেজ থেকে উত্তরে ৪০০ মিটার দূরে সাহেবদের কবরস্থানটির অধিকাংশ জায়গা দখল করে তৈরি হয়েছে ঘরবাড়ি। রাজ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগ এই স্থানটিকে নিয়ে এখনও অবধি সেভাবে গবেষণা চালায়নি। সে কারনে ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য এখনও এখানে মাটির তলায় রয়ে গিয়েছে।

সাহেবদের কবরকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক এক কাহিনি জানা যায়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের ঘটনা। তখন কোচবিহারের রাজা ও ভুটান রাজাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছিল। আর কোচবিহার রাজাদের পক্ষে থেকে সেই যুদ্ধে ফায়দা লুটেছিল ইংরেজরা। যুদ্ধের পর ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে উভয়পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সিনচুলা চুক্তি। সম্পূর্ণ ডুয়ার্স ইংরেজদের দখলে চলে আসে। তবে এই চুক্তির আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার সূত্রেই আজকের এই সাহেবপোঁতা নামের জন্ম।

আলিপুরদুয়ারের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক নীতীশ দাসের মতে, সাহেবপোঁতা অর্থাৎ সাহেবদের পোঁতা হয়েছিল। তার থেকেই এই নাম। উত্তরে জঙ্গল ও পাহাড়, পশ্চিমে শিলতোর্ষা নদী প্রবাহিত। অতীতে যুদ্ধ হয়েছিল এখানেই। এলাকার দক্ষিণে বর্তমান কোচবিহার জেলার পাতলাখাওয়া বনাঞ্চল। এখানেই নাকি ব্রিটিশ সেনাদের শিবির ছিল। আর ব্রিটিশরা স্থানীয়দের সেনা হিসেবে নিয়োগ করত। সেই সেনা শিবিরে প্রশিক্ষনের দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় এক সেনা হেদায়েত আলি খান। সাহেবপোঁতার ঘটনার সাথে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম। এক ইংরেজ সাহেব তখন ওই এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। মোট চারজন ইংরেজ সাহেব ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন কর্নেল পদমর্যাদার। যুদ্ধের প্রথম পর্বে ইংরেজ কর্নেল সহ তিন সাহেব মারা যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে সৈন্যরা আত্মরক্ষার কারণে পিছিয়ে আসে। অন্যদিকে যুদ্ব জয়ের আনন্দে পাহাড়ের পথ ধরে ভুটানবাহিনী। এরই মধ্যে এক চতুর ভারতীয় সৈন্য মৃত কর্নেলের পোষাক পরে এবং ওই কর্নেল সাহেবের ঘোড়ায় চড়ে ছত্রভঙ্গ সৈন্যদের একত্রিত করে ভুটান বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই পালটা আক্রমণে অধিকাংশ ভুটান সেনাই পাহাড়ি ও জঙ্গলের পথে মারা যায়। সেই নকল কর্নেল ছিলেন হেদায়েত আলি খান। যুদ্ধের পর আসল কর্নেল সহ চারজন ইংরেজ সাহেবের নিথর দেহ শিলতোর্ষা নদীর পূর্বদিকে (বর্তমান সাহেবপোঁতা) সমাধিস্থ করা হয়।

ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই খবর পৌঁছানোর পর সাহেবদের কবরের এলাকাটি চিহ্নিত করে যত্ন সহকারে রাখা হয়। পরে সেখানে পিলার বসিয়ে মোটা লোহার শিকল দিয়ে চারটি কবর ঘিরে রাখারও ব্যবস্থা করে ব্রিটিশ সরকার। তবে গবেষকরা অনেক চেষ্টা করেও কর্নেল সহ চার ইংরেজ সাহেবের নাম জানতে পারেনি। এদিকে ওই ঘটনার পর হেদায়েত আলি খানকে পুরস্কর হিসেবে ব্রিটিশ সরকার বেশ কিছু পরগনা দান করেছিল। যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি কর্নেল উপাধিও পেয়েছিলেন।

এখন সেখানে গড়ে ওঠে জনবসতি। মানুষের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে সাহেবদের স্মৃতিচিহ্ন। নীতীশবাবু বলেন,’চরম অবহেলায় সাহেবপোঁতার স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে ওই এলাকাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি ইতিহাসের আরো অজানা তথ্য খুঁজে পেতে এনিয়ে গবেষনা করাও উচিত। কারণ এই স্থানটির সঙ্গে ইতিহাসের অনেক যোগসূত্র থাকা স্বাভাবিক।’

আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের বিডিও শ্রেয়সী ঘোষ বলেন, ‘সাহেবপোঁতার পুরো ইতিহাস আমার জানা নেই। তবে এরকম ঐতিহাসিক জায়গা সম্পর্কে আরো বেশি প্রচার হওয়া দরকার এবং সংরক্ষণের ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

ছবি- সাহেবদের কবরের পাশেই গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি।

তথ্য ও ছবি- সুভাষ বর্মন