কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালে মৃত্যু অব্যাহত, ওএসডির ভূমিকায় প্রশ্ন

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনায় কিছুতেই লাগাম পরানো যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই এই হাসপাতালে এক বা একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এভাবে প্রতিদিন মৃত্যু নিয়ে গত মাসে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একটি উচ্চস্তরীয় বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু তার পরেও মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না। ফলে কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন প্রশ্নের মুখে। মৃত্যুতে লাগাম টানতে এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে সুপারস্পেশালিস্ট টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই কাজও কিছুই এগোয়নি। ফলে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোভিড-১৯এর উত্তরবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার (ওএসডি) ডাঃ সুশান্ত রায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুশান্তবাবু অবশ্য বলেন, চিকিৎসার সবরকম চেষ্টা চলছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর কাওয়াখালির একটি বেসরকারি হাসপাতাল অধিগ্রহণ করে সেখানে ১৭ এপ্রিল থেকে এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা শুরু হয়। অর্থাৎ সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইলনেসের (সারি) হাসপাতাল হিসাবে কাজ শুরু করেছিল ওই হাসপাতাল। প্রথম দিন থেকে প্রচুর রোগী সেখানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হতে শুরু করে। উত্তরবঙ্গের মালদা থেকে শুরু করে কোচবিহারের রোগীদের এই সারি হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছিল। ৩০ মে পর্যন্ত ওই হাসপাতালে কোনও করোনা পজিটিভ রোগী পাওয়া যায়নি। ওই সময় পর্যন্ত সেখানে ১৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের সবারই কোভিড রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল।

- Advertisement -

জুন মাসের শুরু থেকে পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়। ১২ জুন এই কোভিড হাসপাতালে প্রথম একজন মৃত রোগীর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। সেই শুরু। এরপর থেকে মৃতু্য়মিছিল আর থামানো যায়নি। সরকারি সূত্রের খবর, এই হাসপাতালে করোনায় সংক্রামিত হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ২০ জনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বেশ কয়েকজন রোগী এখানে সংকটজনক অবস্থায় রয়েছেন। শিলিগুড়িতে দুটি কোভিড হাসপাতাল রয়েছে। গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে হিমাঞ্চল বিহারের কোভিড হাসপাতালে উপসর্গহীন বা স্বল্প উপসর্গযুক্ত রোগীদের অর্থাৎ লেভেল ১, ২ রোগীদের রাখা হচ্ছে এবং লেভেল ৩, ৪-এর রোগী অর্থাৎ যাঁদের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ তাঁদের কাওয়াখালির এই হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই হাসপাতালেই ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) তৈরি করে সেখানে ওই রোগীদের রাখা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর হার ক্রমশ বাড়তে থাকায় গত মাসের শেষ দিকে স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক করেন ওএসডি সুশান্ত রায়। সেই বৈঠকে কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি সুপারস্পেশালিস্ট টিম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আট সদস্যের সেই টিমে গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি, নিউরো সার্জারি, নিউরো মেডিসিন, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, চেস্ট মেডিসিন, সাইকিয়াট্রিস্ট, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ রাখার কথা ছিল। উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে নিউরো, নেফ্রো, গ্যাস্ট্রো এন্ট্রোলজিস্ট না থাকায় শিলিগুড়ির বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল।

কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের পর ১৫ দিন কেটে গিয়েছে। এখনও কোনও সুপারস্পেশালিস্ট টিম তৈরি করা যায়নি। সাধারণ মেডিকেল অফিসারদের পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসায় একমাত্র ভরসা মেডিকেলের কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। মেডিকেলের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, আমরা কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালে রোগীদের সমস্তভাবে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু অভিযোগ, যে রোগীরা আসছেন তাঁদের বেশিরভাগই চিকিৎসার সুযোগ দিচ্ছেন না। অর্থাৎ সংকটজনক অবস্থায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিলিগুড়ির বিভিন্ন নার্সিংহোম থেকে রোগীদের এই কোভিড হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে। ফলে ওই রোগীরা সেখানে যেতে যেতেই অথবা ছয়-সাত ঘণ্টার মধ্যেই মারা যাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে ওএসডির ভূমিকা নিয়ে চিকিৎসক মহলেই প্রশ্ন উঠেছে। মেডিকেলের চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকেই সুপারস্পেশালিস্ট টিম কাজ শুরু করবে বলে বৈঠকে বলা হয়েছিল। কিন্তু ১০ দিন পরেও কোনও বিশেষজ্ঞকেই নিয়ে আসা যায়নি। সুপারস্পেশালিস্ট দল গঠিত হয়নি। ফলে মৃত্যুর মিছিলও থামানো যাচ্ছে না।